মাত্র ৭০০ টাকা থেকে যাত্রা, ৫ হাজার টাকার ঋণে শিল্প বিপ্লবের সূচনা—আজ বিআরবি গ্রুপ বাংলাদেশের শিল্পায়নের এক অনন্য প্রতীক। ফাইল ছবি
প্রতিটি সাফল্যের আড়ালে থাকে দীর্ঘ সংগ্রাম, অসংখ্য না-বলা গল্প আর অদম্য স্বপ্নের ইতিহাস। কোনো কোনো মানুষের জীবনগাথা শুধু সাফল্যের গল্প নয়—তা হয়ে ওঠে প্রতিকূলতাকে জয় করার অনুপ্রেরণা। কুষ্টিয়ার মাটিতে জন্ম নেওয়া আলহাজ্ব মো. মজিবর রহমান, যিনি মজনু সাহেব নামে পরিচিত, তেমনই এক সংগ্রামী শিল্পোদ্যোক্তার নাম।
দারিদ্র্য, সীমাহীন অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূল বাস্তবতাকে পেছনে ফেলে মাত্র ৭০০ টাকা হাতে নিয়ে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় সেই পথই গড়ে দিয়েছে একটি বৃহৎ শিল্পপরিসর। মাত্র ৫ হাজার টাকার ব্যাংক ঋণ নিয়ে শুরু করা বিআরবি ক্যাবলস আজ বহুমুখী শিল্প উদ্যোগের অংশ। তাঁর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত হাজারো মানুষের জীবিকা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ।
অভাবের অন্ধকার পেরিয়ে আলোর পথে
১৯৪৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ার হাটশ হরিপুর ইউনিয়নের বোয়ালদাহ গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম মজিবর রহমানের। শৈশব থেকেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। স্বপ্ন ছিল বড়, কিন্তু হাতে ছিল না সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের মতো অর্থ কিংবা সুযোগ।
১৯৫৯ সালে মাত্র ৭০০ টাকা পকেটে নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমান তিনি। শুরু করেন ছোট পরিসরের হার্ডওয়্যার ও সাপ্লাই ব্যবসা। এরপর কেটে যায় দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময়—সংগ্রাম, ঝুঁকি, ব্যর্থতা ও নতুন করে দাঁড়ানোর এক কঠিন অধ্যায়।
তাঁর নিজের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে সেই দিনগুলোর কষ্টের কথা। এমন সময়ও গেছে, যখন সন্তানের জন্য দুধ কেনার সামর্থ্য ছিল না। অর্থকষ্টের দিনে একটি সিগারেটও তিনবারে খেয়ে দিন পার করার মতো বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু অভাব তাঁকে থামাতে পারেনি।বরং প্রতিটি সংকটকে তিনি দেখেছেন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ হিসেবে।
যে সিদ্ধান্ত বদলে দিল ইতিহাস
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ তখন শিল্পায়নের পথে এগোচ্ছে। বৈদ্যুতিক ক্যাবলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের জন্য দেশকে অনেকটাই বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হতো। সেই বাস্তবতায় দেশেই উৎপাদনের স্বপ্ন দেখেন মজনু সাহেব।
১৯৭৮ সালের ২৩ অক্টোবর কুষ্টিয়ার কুমারগাড়া বিসিক শিল্পনগরীতে মাত্র ৫ হাজার টাকা ব্যাংক ঋণ নিয়ে যাত্রা শুরু করে বিআরবি ক্যাবলস।
ছোট্ট সেই উদ্যোগই ধীরে ধীরে পরিণত হয় বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে। একটি কারখানার স্বপ্ন ছাড়িয়ে তৈরি হয় নতুন নতুন শিল্প উদ্যোগ, নতুন কর্মসংস্থান এবং দেশীয় উৎপাদনের বিস্তৃত পরিসর।
কুষ্টিয়ার অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার
কুষ্টিয়ার শিল্পাঙ্গনে এক সময় একাধিক বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের দুরবস্থায় কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছিল। সেই বাস্তবতায় বেসরকারি শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেন মজনু সাহেব।
বিআরবি গ্রুপের বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। এর প্রভাব শুধু কর্মক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; অসংখ্য পরিবারের জীবনযাত্রা, সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গেও এই কর্মসংস্থান জড়িয়ে আছে।
একজন মানুষের ব্যবসায়িক উদ্যোগ যখন বহু পরিবারের আয়ের পথ তৈরি করে, তখন সেই সাফল্য আর শুধু ব্যক্তিগত থাকে না—তা একটি অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের অংশ হয়ে ওঠে।
Made in Bangladesh’—দেশীয় শিল্পের বিশ্বযাত্রা
যেসব পণ্য একসময় বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো, সেসব পণ্যের একটি অংশ এখন দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। বাংলাদেশের উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাচ্ছে—যা দেশের শিল্প সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়।
বিআরবি গ্রুপের বিভিন্ন পণ্য ব্রিটেন, জার্মানি, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের বাজারে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের উৎপাদন খাতের সক্ষমতাও তুলে ধরছে। এটি শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিস্তার নয়; দেশীয় শিল্পের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর গল্পও।
শিল্পের পাশাপাশি মানবিকতারও এক আলোকবর্তিকা
মজনু সাহেবের উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নে সম্পৃক্ততা। তাঁর উদ্যোগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞান ভবন, আধুনিক অডিটোরিয়ামসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা গড়ে উঠেছে। ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিআরবি হাসপাতালও।
তাঁর দর্শন—ব্যবসার সুফল কেবল ব্যবসায়ীর কাছে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সমাজের মানুষের জীবনেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে হবে।
এই চিন্তাধারার কারণেই তাঁর শিল্প উদ্যোগের গল্পের সঙ্গে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কথাও উঠে আসে।
জাতীয় স্বীকৃতিতে সম্মানিত এক শিল্পনায়ক
দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি খাতে অবদানের জন্য মজনু সাহেব একাধিক স্বীকৃতি ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। এর মধ্যে সিআইপি (CIP) মর্যাদা, রাষ্ট্রপতির শিল্প উন্নয়ন পুরস্কার এবং জাতীয় রপ্তানি ট্রফি (স্বর্ণ) উল্লেখযোগ্য। এসব স্বীকৃতি তাঁর দীর্ঘ উদ্যোক্তা জীবনের নানা অর্জনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
সফলতার ভিত্তি—সততা, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা, মজনু সাহেবের ব্যবসায়িক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে সততা, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা। তাঁর বিশ্বাস—সততা হারালে ব্যবসা টিকে না, আর নৈতিকতা হারালে সম্মান টিকে না।
দীর্ঘ ব্যবসায়িক পথচলায় এই মূল্যবোধকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি মানুষের আস্থা অর্জনও একজন উদ্যোক্তার বড় সম্পদ।
একজন মানুষের গল্প, একটি জেলার গর্ব, একটি দেশের প্রেরণা
মজিবর রহমান মজনু সাহেবের জীবনগাথা যেন একটি দীর্ঘ অভিযাত্রা—৭০০ টাকা থেকে শুরু, অগণিত প্রতিকূলতা পেরিয়ে শিল্পের বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছানো।
আজ তিনি শুধু একটি শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত নন; কুষ্টিয়ার বহু মানুষের কাছে তিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত একজন উদ্যোক্তা এবং তরুণদের কাছে সংগ্রাম করে এগিয়ে যাওয়ার একটি অনুপ্রেরণার নাম।
তাঁর গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—শুরুটা ছোট হতে পারে, কিন্তু স্বপ্নটা ছোট হওয়া জরুরি নয়।
তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার এক জীবন্ত অধ্যায়
বর্তমান প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের কাছে মজনু সাহেবের জীবন একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। অর্থ, সুযোগ কিংবা প্রতিকূলতা—কোনোটিই সাফল্যের একমাত্র নির্ধারক নয়। সাহস করে শুরু করা, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া, পরিশ্রম চালিয়ে যাওয়া এবং নৈতিক অবস্থান ধরে রাখাও সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
তাঁর ব্যবসায়িক দর্শন ও সংগ্রামের অজানা অধ্যায় জানতে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটিতে দেওয়া তাঁর অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে তিনি নিজের জীবনের কঠিন সময়, সংগ্রাম এবং সাফল্যের পথচলার নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানসমূহ-
* বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।
* বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত বৈদ্যুতিক ক্যাবল ও অপটিক্যাল ফাইবার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান।
* কিয়াম মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।
* নন-স্টিক কুকওয়্যার, অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্র, প্রেশার কুকার, রাইস কুকারসহ বিভিন্ন আধুনিক কিচেন সামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান।
* বিআরবি পলিমার লিমিটেড
* uPVC পাইপ, ফিটিংস ও প্রোফাইল উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান।
* এমআরএস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।
* হেভি ইঞ্জিনিয়ারিং, ফাউন্ড্রি ও শিল্পযন্ত্রাংশ উৎপাদনে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান।
* বিআরবি হাসপাতাল লিমিটেড।
* আধুনিক চিকিৎসাসেবার জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল।
এছাড়াও রয়েছে—লাভলী হাউজিং, বিআরবি সিকিউরিটিজ, টিপিটি ক্যাবলস, বিআরবি এনার্জি, বিআরবি এয়ার, বিআরবি ট্রাভেলসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগ।
কুষ্টিয়ার শিল্পাঙ্গনে মানবিকতার এক উজ্জ্বল নাম
কুষ্টিয়ার মানুষের কাছে মজনু সাহেব শুধু একজন শিল্পোদ্যোক্তা নন; তাঁর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত কর্মসংস্থানের কারণে অনেক পরিবারের জীবনের সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়ে আছে।
বিআরবি, কিয়ামসহ তাঁর সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বহু মানুষ কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাঁদের আয়ের ওপর নির্ভর করছে অসংখ্য পরিবার। একজন কর্মীর হাতে নিয়মিত বেতন পৌঁছানো মানে শুধু একজন মানুষের জীবিকা নিশ্চিত হওয়া নয়—একটি পরিবারের খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তার পথও কিছুটা সহজ হওয়া।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি একজন উদ্যোক্তার সাফল্যের অন্যতম মানবিক মাপকাঠি।
কুষ্টিয়ার অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। সেই ধারায় মজনু সাহেবের উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো বহু মানুষের জীবনে কাজের সুযোগ তৈরি করেছে—যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সফলতার মূলমন্ত্র
মজনু সাহেবের দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী বিশ্বাস—নৈতিকতা, সততা ও কঠোর শৃঙ্খলাই একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় মূলধন।
হয়তো সেই কারণেই ৭০০ টাকার ছোট্ট পুঁজি দিয়ে শুরু হওয়া একটি স্বপ্ন আজ বহু মানুষের কর্মসংস্থান, দেশীয় শিল্প উৎপাদন এবং কুষ্টিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার সঙ্গে যুক্ত একটি বড় নাম।
কুষ্টিয়ার গর্ব, বাংলাদেশের প্রেরণা
একজন মানুষের সাফল্য তখনই বৃহত্তর অর্থ পায়, যখন সেই সাফল্যের আলো অন্য মানুষের জীবনেও পৌঁছে যায়। মজিবর রহমান মজনু সাহেবের শিল্পযাত্রার গল্পে সেই আলো খুঁজে পাওয়া যায়—কর্মসংস্থানে, উৎপাদনে, শিল্পায়নে এবং মানুষের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ তৈরিতে।
কুষ্টিয়ার বোয়ালদাহ গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের সন্তান থেকে শিল্পোদ্যোক্তা—এই দীর্ঘ পথচলা তাই কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের ইতিহাস নয়; এটি অধ্যবসায়, সাহস ও স্বপ্নের এক বিস্ময়কর গল্প।
আজকের তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য তাঁর জীবন যেন একটি নীরব বার্তা—
শুরুটা যতই ছোট হোক, স্বপ্ন যদি বড় হয়, পরিশ্রম যদি অব্যাহত থাকে এবং সততা যদি পথ দেখায়—তাহলে একদিন সেই ছোট্ট স্বপ্নই হয়ে উঠতে পারে হাজারো মানুষের জীবনের আলো।
কুষ্টিয়ার মানুষের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতেও তাঁর উদ্যোগগুলো আরও বিস্তৃত হবে, নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং আরও বেশি সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবন ও ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ পাবেন।
প্রাণের কুষ্টিয়ার মাটি থেকে উঠে আসা মজনু সাহেবের এই সংগ্রাম—একজন মানুষের সাফল্যের গল্পের চেয়েও বড়; এটি স্বপ্ন দেখার, লড়াই করার এবং অন্যের জীবনেও সেই স্বপ্নের আলো পৌঁছে দেওয়ার গল্প।
