ঢাকার দুই বিলাসবহুল বাড়ি থেকে পূর্বাচলের প্লট, টাঙ্গাইলে ডুপ্লেক্স-তিনতলা মার্কেট, যুক্তরাষ্ট্রে ফ্ল্যাট—অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ। ফাইল ছবি
গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সাইফুর রহমানকে ঘিরে উঠেছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন, নামে-বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা, প্রভাব খাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে পোস্টিং এবং সরকারি উন্নয়নকাজের বরাদ্দ থেকে সুবিধা নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ। বর্তমানে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের খুলনা জোনের দায়িত্বে রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, দীর্ঘ চাকরিজীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির নানা অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ ওঠে।
সূত্রগুলোর ভাষ্য, সরকারি চাকরির পাশাপাশি প্রভাবশালী ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে তিনি নামে-বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসায়ও জড়িয়ে পড়েন। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, বিল অনুমোদন ও দাপ্তরিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ ঠিকাদারি বলয় গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
আজিমপুরে ‘১০ শতাংশ’ বাণিজ্যের অভিযোগ
অনুসন্ধানের প্রাথমিক পর্যায়ে একাধিক ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, তার সময়েই সেখানে কথিত সিন্ডিকেট ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়, যার প্রভাব এখনো রয়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, ‘১০ শতাংশ’ কমিশন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করা হতো না। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যাচাই এখনো প্রয়োজন।
একই সময়ে ডিভিশনের একজন নারী হিসাব সহকারীকে ঘিরেও নানা মুখরোচক আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছিল বলে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ জানিয়েছেন। তবে ব্যক্তিগত ও স্পর্শকাতর এই অভিযোগের বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া না গেলে তা সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। ফলে বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।
বাড়ি, প্লট, মার্কেট থেকে বিদেশে ফ্ল্যাট—কোথায় নেই সম্পদ?
অনুসন্ধানের প্রাথমিক পর্যায়ে সাইফুর রহমানের নামে ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা বলে দাবি করা একাধিক সম্পদের তথ্য সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে রয়েছে দুটি বিলাসবহুল বাড়ি। রাজধানীর বাইরে পূর্বাচলেও রয়েছে প্লট থাকার তথ্য।
টাঙ্গাইলের ঘাটাইল এলাকায় রয়েছে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি। বাজার রোডে রয়েছে তিনতলা একটি মার্কেট। তবে ওই মার্কেটটি নিজের নয়, ভাইয়ের নামে এবং পারিবারিক বা এজমালি সম্পত্তির অংশ বলে দাবি করেছেন সাইফুর রহমান।
এছাড়া সালাউদ্দিন সেনানিবাস মোড় এলাকায় আগে একটি এলপিজি ফিলিং স্টেশন ছিল বলে জানা গেছে। বর্তমানে সেটি ভেঙে সেখানে ‘সোনারতরী পার্ক’ নামে একটি স্থাপনা গড়ে ওঠার তথ্য পাওয়া গেছে। এর কাছাকাছি প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যে জমি কিনে ‘কাঠবাদাম রেস্টুরেন্ট’ স্থাপনের তথ্যও অনুসন্ধানে এসেছে।
শুধু দেশেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রেও তার পরিবারের সম্পদ থাকার অভিযোগ রয়েছে। সূত্রের দাবি, সেখানে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যেখানে তার মেয়ে বসবাস করেন।
সব মিলিয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধানে অর্ধশত কোটি টাকারও বেশি সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে। তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস এবং সম্পদ অর্জনের বৈধতা যাচাই করতে ভূমি রেকর্ড, আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, কোম্পানি ও ব্যবসায়িক নথিসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালী ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ
সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি আলোচিত ঠিকাদার জিকে শামীম ও গোল্ডেন মনিরের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় প্রভাবশালী ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে পোস্টিং বাগিয়ে নেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য দলিল বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এছাড়া জিকে শামীম ও গোল্ডেন মনিরের অর্থায়নে রাজধানীর কয়েকটি অভিজাত হোটেলে বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে বলে কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে। এসব অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং এগুলোর সত্যতা নির্ধারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন নিয়েও অভিযোগ
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগের পক্ষে থেকে সহিংসতা ও কথিত গণহত্যায় অর্থায়নের নেপথ্যে সাইফুর রহমানের ভূমিকা ছিল—এমন অভিযোগও স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রে শোনা যায়।
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে কোনো মামলা, তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের নথি এই অনুসন্ধানের পর্যায়ে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটি প্রমাণিত দাবি হিসেবে নয়, বরং তদন্তসাপেক্ষ অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে সম্পদের উৎস নিয়ে
একজন সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয়, চাকরিজীবনের বেতন-ভাতা, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদ এবং অন্যান্য বৈধ আয়ের সঙ্গে তার নামে-বেনামে থাকা বিপুল সম্পদের সামঞ্জস্য আছে কি না—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
বিশেষ করে রাজধানীতে একাধিক মূল্যবান স্থাপনা, পূর্বাচলে প্লট, টাঙ্গাইলে ডুপ্লেক্স ও মার্কেট, ব্যবসায়িক স্থাপনা এবং যুক্তরাষ্ট্রে সম্পত্তি থাকার অভিযোগ সত্য হলে এসব সম্পদের অর্থের উৎস কী—তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো যদি আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক লেনদেন, ভূমি রেজিস্ট্রি এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের তথ্য যাচাই করে, তাহলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
সাইফুর রহমানের বক্তব্য
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাইফুর রহমানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি টাঙ্গাইলের সম্পদগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এবং এজমালি সম্পদ বলে দাবি করেন।
অন্য অভিযোগগুলো সত্য নয় বলেও তিনি লিখিত বার্তায় জানান। তবে তার বক্তব্যের বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধান চলমান
সাইফুর রহমানের নামে-বেনামে থাকা কথিত সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ, মালিকানা এবং অর্থের উৎস নিয়ে অনুসন্ধান এখনো চলমান। একই সঙ্গে তার দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন প্রকল্পে ঠিকাদারি কাজ, বিল অনুমোদন, পোস্টিং, সম্পদ বিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক লেনদেনের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
অভিযোগগুলোর কোনোটি সত্য হলে তা শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনিয়মের বিষয় নয়; বরং সরকারি উন্নয়নকাজের অর্থ ব্যবস্থাপনা, ঠিকাদারি প্রক্রিয়া এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
সুতরাং অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রের আলোকে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ এখন সময়ের দাবি। অনুসন্ধানের পরবর্তী পর্বে সংশ্লিষ্ট সম্পদের মালিকানা, কথিত ঠিকাদারি সিন্ডিকেট, প্রকল্পভিত্তিক লেনদেন এবং সম্পদ অর্জনের অর্থের উৎস সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত থাকবে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে…….
