মঙ্গলবার, ১লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রেলওয়ের ডিজির পিএস নাসির উদ্দিন, ক্ষমতার বলয়ে নিয়োগ বাণিজ্য থেকে সম্পদ—কোটি টাকার অভিযোগ, তদন্তের দাবি

স্টাফ রিপোর্টার
সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬ ৬:৪১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

নাসির উদ্দিন। ফাইল ছবি

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) আফজাল হোসেনের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মো. নাসির উদ্দিনকে ঘিরে উঠেছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। নিয়োগ বাণিজ্য, প্রভাব খাটানো, রেলের জমি লিজ ও উচ্ছেদে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, সম্পদ অর্জন এবং ব্যক্তিগত জীবনসংক্রান্ত নানা অভিযোগে এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছেন এই কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্ট অভিযোগকারীদের দাবি, ক্ষমতাধর মহলের ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে নাসির উদ্দিন রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাধারণ পরিবার থেকে রেলওয়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তা

টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার আউশনারা ইউনিয়নের হলুদিয়া কৈয়াপাড়ার মৃত নবাব আলী ও ফাতেমা বেগম দম্পতির কনিষ্ঠ সন্তান নাসির উদ্দিন। মধুপুর শহীদ স্মৃতি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০০৩ সালে এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি।

সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এবং মেধাবী হিসেবে পরিচিত নাসির উদ্দিন ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ রেলওয়েতে যোগ দেন। চাকরিজীবনে ধাপে ধাপে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসার পর বর্তমানে তিনি রেলওয়ের মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তবে এই পদে তাঁর নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

ডিজির পিএস পদে নিয়োগ ঘিরে প্রশ্ন

অভিযোগকারীদের দাবি, ডিজির পিএস হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার আগে নাসির উদ্দিন সংশ্লিষ্ট ডিজিকে এসএমএস করে নিজেকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। ওই এসএমএসের একটি কপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার কথাও জানা গেছে।

তবে এসএমএসটি কতটা প্রামাণ্য এবং তাঁর নিয়োগ প্রক্রিয়া বিধিসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়েছিল কি না—তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ, নথি ও প্রশাসনিক অনুমোদন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

লেবার সর্দার নিয়োগে ‘প্রভাবের’ অভিযোগ

২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে কর্মকর্তা (ডিটিএ) হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে লেবার সর্দার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি খুলনার সিঙ্গিয়া স্টেশনের গুডস ইয়ার্ডে মোদাচ্ছের আলীকে অস্থায়ী লেবার সর্দার হিসেবে নিয়োগ দিতে তিনি সিঙ্গিয়া স্টেশন মাস্টারকে নির্দেশ দেন। অথচ রেলওয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের নিয়োগের এখতিয়ার সাধারণত সংশ্লিষ্ট স্টেশন মাস্টারের।

এরপর ১৬ ফেব্রুয়ারি স্টেশন মাস্টার মো. শরীফুজ্জামান ওই নিয়োগ দেন। তবে নিয়োগপত্রে মেয়াদ উল্লেখ ছিল না বলে অভিযোগ রয়েছে।

রেলওয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ওই নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যশোর ও সিঙ্গিয়া স্টেশনেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল বলে জানা যায়। যদিও এসব অভিযোগের চূড়ান্ত তদন্ত ফলাফল স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন ও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার কথাও জানা গেছে।

সহকারী স্টেশন মাস্টার নিয়োগেও অভিযোগ

২০১৬ সালের জুলাইয়ে সহকারী স্টেশন মাস্টার পদে ২৫৭ জনের নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

অভিযোগ ছিল, নিয়োগ তালিকা প্রকাশের আগে নম্বরের টেবুলেশন শিট প্রস্তুত করা হয়নি এবং কোটা ব্যবস্থার অপব্যবহার করা হয়েছে। এক চাকরিপ্রার্থীর দাবি, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও চাহিদামতো ১০ লাখ টাকা দিতে না পারায় তাঁর নিয়োগ হয়নি।

তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট তদন্ত নথি ও দুদকের অনুসন্ধান-সংক্রান্ত বর্তমান অবস্থা জানা প্রয়োজন।

রেলের জমি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ

নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে রেলের জমি লিজ, উচ্ছেদ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক সিদ্ধান্তে তাঁর অনানুষ্ঠানিক প্রভাব ছিল।

এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট লিজ নথি, উচ্ছেদ-সংক্রান্ত আদেশ, ফাইল নোট এবং অনুমোদনকারী কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এরই মধ্যে রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রী, পিএস বা তাঁদের আত্মীয়ের রেফারেন্সে অবৈধ সুযোগ না দেওয়ার নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের একান্ত সচিব মোহাম্মদ আতিকুর জানিয়েছিলেন, তাঁর রেফারেন্সে এক বন্ধুর টিকিট সংগ্রহের ঘটনা জানার পর তিনি সংশ্লিষ্ট স্টেশন মাস্টারকে এ ধরনের রেফারেন্স প্রত্যাখ্যানের নির্দেশ দেন এবং যোগাযোগকারী নম্বরগুলো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

কোটি টাকার সম্পদের উৎস কোথায়?

নাসির উদ্দিনের সম্পদ নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর গ্রামের বাড়িতে ব্যয়বহুল ডুপ্লেক্স ভবন, ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে নিজ নামে বা বেনামে জমি-প্লট এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে একটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে।

এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস এবং তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—তা যাচাই করা হয়নি। রেলের এক কর্মচারী অতীতে এ বিষয়ে দুদকে অভিযোগ করেছিলেন বলেও দাবি রয়েছে। তবে অভিযোগটির বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ফলে সম্পদের বিষয়টি নিয়ে অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্তের বদলে আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, জমির দলিল, ব্যাংক লেনদেন ও কোম্পানি/ব্যবসায়িক মালিকানার তথ্য যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও বিস্তর অভিযোগ

নাসির উদ্দিনের ব্যক্তিগত জীবন ঘিরেও বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সাল থেকে তাঁর সঙ্গে সাইদা পারভীনের পরিচয় হয় এবং ১৭ মে ২০২৩ তাঁদের বিয়ে হয়, যা ১ জুন ২০২৩ রেজিস্ট্রি করা হয়।

সাইদা পারভীনের অভিযোগ, বিয়ের আগে নাসির উদ্দিন তাঁর পূর্ববর্তী বৈবাহিক জীবনের তথ্য গোপন করেছিলেন। পরে তিনি জানতে পারেন, এটি তাঁর তৃতীয় বিয়ে।

বিয়ের পর ৩০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করা হয় এবং তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মানসিক নির্যাতন ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ করেন সাইদা পারভীন। একই সঙ্গে ২৫ মে ২০২৩ থেকে ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ, চরিত্রহনন ও হুমকির অভিযোগও করেন তিনি।

এ ছাড়া প্রথম স্ত্রী তানিয়ার সঙ্গে দাম্পত্য কলহ ও বিচ্ছেদ নিয়ে মামলা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব ব্যক্তিগত অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মামলা, আদালতের নথি ও প্রত্যেক পক্ষের বক্তব্য যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।

রাজনৈতিক পরিচয় ও পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, নাসির উদ্দিনের পরিবার দীর্ঘদিন আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তিনি সুবিধাজনক পদায়ন পেয়েছেন।

রেলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর একই জেলার বাসিন্দা হিসেবে দীর্ঘদিনের পরিচয় এবং রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

ডিজির ‘ক্যাশিয়ার’—অভিযোগ কতটা সত্য?

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো, রেলওয়ের বর্তমান ডিজি আফজাল হোসেনের অবৈধ অর্থ সংগ্রহে নাসির উদ্দিন ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে কাজ করেন এবং বড় কাজগুলো নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটকে পাইয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছেন।

এছাড়া ডিজি ও তাঁর পিএস উভয়ের বিরুদ্ধে নারীসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগের তথ্য-প্রমাণ থাকার দাবিও করা হয়েছে। তবে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রামাণ্য নথি, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যাচাই না করে সেগুলোকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব তথ্য-প্রমাণ যাচাই-বাছাই করে পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হবে।

তদন্তের দাবি

অভিযোগকারী সাইদা পারভীনসহ সংশ্লিষ্টরা নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবিগুলো হলো—

অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা।

তদন্তকালীন অভিযোগকারী ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

লেবার সর্দার ও সহকারী স্টেশন মাস্টার নিয়োগের নথি যাচাই।

রেলের জমি লিজ ও উচ্ছেদ-সংক্রান্ত ফাইল পর্যালোচনা।

ডিজির পিএস পদে নাসির উদ্দিনের নিয়োগ প্রক্রিয়া যাচাই।

তাঁর ও পরিবারের নামে থাকা সম্পদের বৈধ উৎস অনুসন্ধান।

জবাব মেলেনি নাসির উদ্দিনের

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে নাসির উদ্দিনের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর বক্তব্য এ প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন এখন একটাই—একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে নিয়োগ, পদায়ন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও সম্পদ অর্জন নিয়ে এতগুলো অভিযোগের কেন্দ্রে আসেন?

লেবার সর্দার নিয়োগ থেকে সহকারী স্টেশন মাস্টার নিয়োগ, রেলের জমি লিজ-উচ্ছেদ থেকে ডিজির পিএস পদে নিয়োগ এবং কথিত কোটি টাকার সম্পদ—প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা প্রশাসনিক নথি ও স্বাধীন তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে।

রেলওয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং দুদকের উচিত অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে পাশ কাটিয়ে নথিভিত্তিক, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র জনসম্মুখে আনা।

এসব অভিযোগের বিস্তারিত থাকবে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে………..

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।