ফাইল ছবি
একদিন-দুইদিন নয়—দীর্ঘ ১৫ বছর শিক্ষকতা করেছেন মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটের প্রাথমিক শাখায়। শ্রেণিকক্ষে কাটিয়েছেন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়, গড়ে তুলেছেন অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। অথচ দেড় দশকের সেই কর্মজীবনের পর হঠাৎই চাকরি হারানোর অভিযোগ তুলেছেন সহকারী শিক্ষক মোসাম্মৎ রোকেয়া খাতুন।
তার দাবি, চাকরি হারানোর পেছনে কাজ করেছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। প্রায় ১৫ বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০২৫ সালের ২২ মে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বর্তমানে চাকরিতে পুনর্বহাল ও পেশাগত অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তিনি।
সম্প্রতি জাতীয় প্রেসক্লাবে দেওয়া এক লিখিত অভিযোগে নিজের চাকরি হারানো, পরবর্তী সময়ে পুনর্বহালের চেষ্টা এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে কথিত অনিয়মের নানা বিষয় তুলে ধরেছেন রোকেয়া খাতুন।
১৫ বছরের কর্মজীবনের পর হঠাৎ অব্যাহতি
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০১০ সালের ৮ আগস্ট মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটের প্রাথমিক শাখায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন রোকেয়া খাতুন। দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৫ সালের ২২ মে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।
তার দাবি, এত বছরের চাকরিজীবনে দায়িত্ব পালনের পরও তাকে যে প্রক্রিয়ায় চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেটি ছিল অন্যায্য এবং এর পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করেছে।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সহযোগিতাই কি ‘অপরাধ’?
রোকেয়া খাতুনের অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ঘিরে রয়েছে ছাত্র-জনতার আন্দোলন।
তার দাবি, আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করার কারণে তাকে ‘অপরাধী’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অভিযোগপত্রে তিনি দাবি করেছেন, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষিকা জিনাত ফারহানা এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক আহমাদুল্লাহ কাসেমী তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তার বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
প্রশাসনের অনুমতি, তবু কর্মস্থলে যোগ দিতে বাধা?
চাকরি হারানোর পর হাল ছাড়েননি রোকেয়া খাতুন। পুনর্বহালের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন তিনি।
তার দাবি, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না পাওয়ায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে পুনরায় চাকরিতে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু এরপরও প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষিকা ও সহকারী প্রধান শিক্ষক প্রশাসনের ওই নির্দেশ অমান্য করে তাকে কর্মস্থলে যোগ দিতে বাধা দেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
যদি এই অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—প্রশাসনের অনুমতি থাকা সত্ত্বেও একজন দীর্ঘদিনের শিক্ষককে কর্মস্থলে যোগ দিতে বাধা দেওয়ার কারণ কী?
চাকরির অভিযোগের সঙ্গে সামনে এসেছে অনিয়মের প্রসঙ্গও
নিজের চাকরি হারানোর অভিযোগের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা ও শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগও তুলেছেন রোকেয়া খাতুন।
অভিযোগপত্রে তিনি দাবি করেছেন, প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষিকা জিনাত ফারহানা এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক আহমাদুল্লাহ কাসেমীর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাদের বিরুদ্ধে যথাক্রমে ৪৫ লাখ টাকা ও ২২ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল বলেও দাবি করেছেন তিনি।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব দাবির স্বতন্ত্র প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি অভিযোগপত্রের সঙ্গে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া জরুরি।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং দলীয় নেতাদের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও করেছেন রোকেয়া খাতুন।
তবে এসব অভিযোগও তার লিখিত বক্তব্যের ভিত্তিতে পাওয়া; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ ছাড়া এগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
দেড় বছর ধরে অনিশ্চয়তা, সংসারে সংকট
চাকরি হারানোর পর থেকে শুধু একটি পদ নয়—রোকেয়া খাতুনের ভাষ্য অনুযায়ী, তার জীবনের স্থিতিশীলতাও যেন থমকে গেছে।
অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রায় দেড় বছর ধরে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দীর্ঘ ১৫ বছর যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কর্মস্থল হিসেবে আপন করে নিয়েছিলেন, সেখানেই ফিরে যাওয়ার আকুতি এখন তার।
একদিকে চাকরি হারানোর বেদনা, অন্যদিকে সংসারের আর্থিক সংকট—দুইয়ের চাপ যেন একসঙ্গে চেপে বসেছে তার জীবনে। ১৫ বছরের কর্মজীবনের স্মৃতি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাটানো সময় আর হারানো পেশাগত পরিচয় তাকে আবেগাপ্লুত করে তুলছে। আর সেই অধিকার ফিরে পেতেই এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ছুটছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে পুনর্বহালের আবেদন
অভিযোগপত্রের শেষাংশে রোকেয়া খাতুন নিজেকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার না করে মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটের প্রাথমিক শাখার সহকারী শিক্ষক পদে পুনর্বহালের ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন।
তার ভাষায়, আমি ন্যায়বিচার ও আমার পেশাগত অধিকার ফিরে পেতে চাই।
উত্তর খুঁজছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
রোকেয়া খাতুনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এখন সামনে এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
দীর্ঘ ১৫ বছর চাকরি করার পর ঠিক কী কারণে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হলো?
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করার অভিযোগ কি চাকরি হারানোর কারণ হয়েছিল?
প্রশাসন যদি তাকে পুনরায় যোগদানের অনুমতি দিয়ে থাকে, তাহলে কর্মস্থলে যোগ দিতে বাধা দেওয়া হলো কেন?
প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই স্পষ্ট হবে—এটি কি কেবল একজন শিক্ষিকার চাকরি হারানোর ঘটনা, নাকি এর আড়ালে রয়েছে আরও কোনো প্রশাসনিক কিংবা রাজনৈতিক বাস্তবতা?
এদিকে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ওয়েবসাইটে মিরপুর-১০, ঢাকায় স্কুলটির কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার তথ্য এবং প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে জিনাত ফারহানার নাম উল্লেখ রয়েছে।
প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ, প্রধান শিক্ষিকা জিনাত ফারহানা ও সহকারী প্রধান শিক্ষক আহমাদুল্লাহ কাসেমীর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে যুক্ত করা হবে।
