ফাইল ছবি
রাষ্ট্রের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ রাজস্ব প্রশাসন। কর, শুল্ক ও ভ্যাটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখার এই বিশাল ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু জাতীয় রাজস্ব বোর্ড—এনবিআর। সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে এখন আহসান হাবিব। ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তিনি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর আগে এনবিআরের সদস্য (কর প্রশাসন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) হিসেবে তিনি নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
একজন কর কর্মকর্তার দীর্ঘ কর্মজীবনে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক প্রজ্ঞা, রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের যে সমন্বিত পরিণতি তৈরি হয়—আহসান হাবিবের কর্মজীবনে তারই সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। এনবিআরের অফিসিয়াল প্রোফাইল অনুযায়ী, তিনি বিসিএসের ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা এবং কর ক্যাডারে প্রথম স্থান অর্জন করে ১৫ নভেম্বর ১৯৯৫ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন।
মেধার স্বাক্ষর শিক্ষাজীবনেই
ঝালকাঠি জেলার এক পরিবারে জন্ম নেওয়া আহসান হাবিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করেন। স্নাতক (সম্মান) এবং স্নাতকোত্তর—দুই পর্যায়েই তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন; স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার তথ্যও উল্লেখ রয়েছে এনবিআরের প্রোফাইলে।
তবে তাঁর কর্মজীবনের প্রকৃত অভিযাত্রা শুরু হয় সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর। কর ক্যাডারে প্রথম স্থান অর্জন করে চাকরিতে প্রবেশের পর প্রায় তিন দশকের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তিনি আজ পৌঁছেছেন রাজস্ব প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বে।
মাঠ থেকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে
কর্মজীবনে আহসান হাবিব শুধু কেন্দ্রীয় প্রশাসনের পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। ঢাকা, খুলনা ও রংপুরসহ বিভিন্ন কর অঞ্চল এবং কর আপিল অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। কর অঞ্চল-১, ২, ৬, ৭, ৮ ও ১৫, ঢাকা; কর অঞ্চল খুলনা ও রংপুর; কর আপিল অঞ্চল খুলনা ও রাজশাহী এবং কেন্দ্রীয় কর জরিপ অঞ্চলেও তাঁর দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
মাঠপর্যায়ের দীর্ঘ এই অভিজ্ঞতায় তাঁর মেধা, প্রজ্ঞা, যোগ্যতা ও প্রশাসনিক দক্ষতার বহুমাত্রিক প্রকাশ ঘটেছে। কর ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা, করদাতার সঙ্গে প্রশাসনের সম্পর্ক এবং রাজস্ব আদায়ের নানা চ্যালেঞ্জকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। প্রজ্ঞা ও সাবলীল ব্যক্তিত্বের সমন্বয়ে দায়িত্ব পালনের এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তাঁকে কর প্রশাসনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করার শক্ত ভিত তৈরি করে দেয়।
তিনি বিসিএস কর একাডেমির পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি প্রশাসনিক সক্ষমতা ও দক্ষতার কারণে সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল—সিআইসি এবং কর পরিদর্শন পরিদপ্তরের মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত মহাপরিচালকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব পালন করেন।
শুধু কর আদায় নয়, আধুনিক রাজস্ব ব্যবস্থার প্রস্তুতিও
রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এখন আর শুধু কাগজপত্র, কর নির্ধারণ ও আদায়ের প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ডিজিটালাইজেশন, আর্থিক অপরাধ শনাক্তকরণ, ই-পেমেন্ট, অটোমেশন ও আধুনিক কর ব্যবস্থাপনা ক্রমেই হয়ে উঠছে রাজস্ব প্রশাসনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ।
সময়ের এই পরিবর্তন ও ভবিষ্যতের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আহসান হাবিব দেশে-বিদেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাঁর প্রশিক্ষণের মধ্যে রয়েছে কম্পিউটার অ্যাপ্রিসিয়েশন, ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম এবং প্রকিউরমেন্ট ম্যানেজমেন্ট। বিদেশে ভারতের N.A.D.T, মালয়েশিয়ান ট্যাক্স একাডেমি ও ফিলিপাইনে কর অটোমেশন এবং ই-পেমেন্ট ব্যবস্থার ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
এ ছাড়া ব্রাসেলস, বুলগেরিয়া, জাপান ও মালয়েশিয়ায় ইলিসিট ফিন্যান্সিয়াল ফ্লো, ডোমেস্টিক রেভিনিউ মোবিলাইজেশন (DRM) এবং Medium Term Revenue Strategies (MTRS) বিষয়েও উচ্চতর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন।
এসব অভিজ্ঞতা তাঁর কর্মদক্ষতার পরিধিকে যেমন বিস্তৃত করেছে, তেমনি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব প্রশাসন সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকেও করেছে আরও পরিণত ও সুদূরপ্রসারী।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
এনবিআর দেশের কর প্রশাসনের শীর্ষ কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানটির কাজের পরিধি আয়কর, ভ্যাট, কাস্টমসসহ রাষ্ট্রের রাজস্ব সংগ্রহের বিস্তৃত ব্যবস্থাকে ঘিরে। এনবিআরের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, এটি বাংলাদেশের কর প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনিকভাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের অধীন।
ফলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে আহসান হাবিবের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পাশাপাশি করদাতাবান্ধব পরিবেশ তৈরি, কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং কর ফাঁকি ও আর্থিক অপরাধ মোকাবিলা—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে তাঁকে।
বর্তমানে এনবিআরের কার্যক্রমেও ডিজিটাল সেবার বিস্তার স্পষ্ট। ২০২৬-২৭ করবর্ষের ই-রিটার্ন চালু, অনলাইন নিলাম, বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডোসহ বিভিন্ন ডিজিটাল উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি সেবাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর করার পথে এগোচ্ছে।
ব্যক্তিত্বে শৃঙ্খলা, নেতৃত্বে অভিজ্ঞতা
এনবিআরের অফিসিয়াল প্রোফাইলে আহসান হাবিবকে সৎ, মেধাবী, দক্ষ ও সদালাপী কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি বর্তমানে তিনি বিসিএস (ট্যাক্সেশন) অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি বিবাহিত এবং দুই সন্তানের জনক।
কর্মজীবনের দীর্ঘ পথচলায় দায়িত্বের প্রতিটি স্তরে অর্জিত অভিজ্ঞতা, শৃঙ্খলা, প্রজ্ঞা ও সাবলীল নেতৃত্বের সমন্বয়ই যেন তাঁর পেশাগত পরিচয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।
এখন নজর রাজস্ব ভবনে
একদিকে দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের কর ব্যবস্থাপনার বাস্তব জ্ঞান—এই দুইয়ের সমন্বয় নিয়েই এনবিআরের শীর্ষ দায়িত্বে এসেছেন আহসান হাবিব।
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি করদাতার আস্থা অর্জন এবং আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ রাজস্ব প্রশাসন গড়ে তোলার প্রত্যাশাও রয়েছে তাঁর নেতৃত্বকে ঘিরে।
অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে রাজস্বের বিকল্প নেই। আর সেই রাজস্ব ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণকক্ষ যখন এনবিআর, তখন এর নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তির প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতির বিস্তৃত পরিসরে।
তাই আহসান হাবিবের সামনে এখন শুধু একটি পদ নয়—একটি বিশাল রাজস্ব প্রশাসনকে আরও কার্যকর, আধুনিক, দক্ষ ও জনবান্ধব করে তোলার বড় দায়িত্ব। দীর্ঘ কর্মজীবনে সঞ্চিত অভিজ্ঞতা, মেধা, যোগ্যতা ও প্রশাসনিক প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে সেই দায়িত্ব তিনি কতটা সফলভাবে সামলাতে পারেন—এখন সেদিকেই তাকিয়ে রাজস্ব প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মহল।
