সরকার আসে, সরকার যায়—গণপূর্তের চেয়ার আঁকড়ে মাসুদ রানা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনেও অটুট প্রভাববলয়; মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর ‘আত্মীয়’ পরিচয়ে পদ আঁকড়ে থাকার অভিযোগ। ফাইল ছবি
সরকার আসে, সরকার যায়; রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বদলে যায় ক্ষমতার কেন্দ্র। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা যেন সব সরকারের আমলেই ‘অপরাজেয়’। সময়ের হাওয়ায় তারা গিরগিটির মতো রং বদলান, পাল্টান রাজনৈতিক পরিচয়, আর নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে গুরুত্বপূর্ণ চেয়ার আঁকড়ে রাখেন।
এমনই একজন হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন ২৭তম বিসিএসের গণপূর্ত ক্যাডারের কর্মকর্তা এবং ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানা। তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অবস্থান বদলে প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এক সময়ের আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ বলয়ের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তা পরবর্তীতে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেকে ‘বিপরীত ঘরানার’ লোক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।
পাবনা থেকে শুরু, ঢাকায় প্রভাবের বিস্তার
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মাসুদ রানা ২০১৪ সাল পর্যন্ত পাবনা গণপূর্ত উপ-বিভাগ-১-এ দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় তিনি তৎকালীন পাবনার নির্বাহী প্রকৌশলী এবং বর্তমানে প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর রাজশাহী গণপূর্ত উপ-বিভাগ-২ এবং ২০১৬ সালের ৩ মার্চ পদোন্নতি পেয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে যোগ দেন তিনি।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, গণপূর্তের বিভিন্ন উন্নয়ন ও নির্মাণকাজে কমিশন-বাণিজ্যের অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে মেরামতকাজের চেয়ে বড় ভবন নির্মাণে তথাকথিত ‘সেভিংস’ বা সাশ্রয়ের অর্থ ভাগবাটোয়ারার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিয়মবহির্ভূতভাবে বাঁশ-কাঠের সেন্টারিং ব্যবহার করে বিভিন্ন কাজ করানোর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
রাজশাহী ডিভিশন-১: শুরু হয় প্রভাবের নতুন অধ্যায়
২০১৮ সালের ডিসেম্বরে উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-১-এ পদায়ন পান মাসুদ রানা। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে যোগদানের পর তাঁর প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়।
এ সময় রাজশাহীর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে খালেকুজ্জামান দায়িত্বে আসার পর মাসুদ রানা তাঁর ঘনিষ্ঠ বলয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। এমনকি খালেকুজ্জামানের কথিত অবৈধ কমিশনের অর্থ সংগ্রহ ও সমন্বয়ের দায়িত্বও নাকি তাঁর ওপর ছিল বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসা জরুরি।
শামীম আখতার আমলে ‘রাজশাহী বলয়’?
২০২০ সালের ১৪ ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন শামীম আখতার। তাঁর সময়ের গণপূর্ত অধিদপ্তর ঘিরে নানা অনিয়ম ও প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বলয় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, শামীম আখতারকে কেন্দ্র করে রাজশাহী ও আশপাশের জেলার একাধিক কর্মকর্তার একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে ওঠে। এই বলয়ে আতিক, হারুন, মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে সবুজ, আজমুল হক মুন এবং পাবনার মাসুদ রানার নামও বিভিন্ন অভিযোগে উঠে আসে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এই বলয়ের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন, ঠিকাদারি কাজ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হতো।
আত্মীয়তার সূত্রেও কি পদায়নের ‘সিঁড়ি’?
মাসুদ রানার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সবচেয়ে আলোচিত অংশ তাঁর কথিত আত্মীয়তার সম্পর্ককে ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের দাবি।
অভিযোগ রয়েছে, শামীম আখতারের শ্বশুরবাড়ি নারায়ণগঞ্জের ভুঁইগড় দরবার শরীফ এলাকায় হওয়ায় এবং মাসুদ রানার শ্বশুরবাড়িও একই এলাকায় হওয়ায় তিনি শামীম আখতারের বিশেষ ঘনিষ্ঠজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন।
এরপর ২০২১ সালে পাবনার তৎকালীন মন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলু এবং ‘চুপ্পু’ নামে পরিচিত আরও দুই প্রভাবশালী ব্যক্তির মাধ্যমে তদবির করে শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ পদায়ন বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
দুই কোটি টাকার ‘নজরানা’র অভিযোগ
অভিযোগের আরেকটি গুরুতর অংশ ২০২৪ সালের পদায়নকে ঘিরে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই তৎকালীন মন্ত্রী ওবায়দুল মুক্তাদিরের কাছে মাসুদ রানা, আতিক ও চুনু মিলে দুই কোটি টাকা ‘নজরানা’ দিয়ে ঢাকায় পোস্টিং নিশ্চিত করেন।
তবে এই অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি, আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বীকারোক্তি প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত এটিকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
ওই সময় গণপূর্ত অধিদপ্তরের পাঁচ প্রভাবশালী নির্বাহী প্রকৌশলীর বারবার ঢাকায় পদায়ন নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, মাসুদ রানাও ছিলেন সেই তালিকার একজন—যাঁদের দীর্ঘদিন ঢাকার বাইরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের নজির খুবই সীমিত।
আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ‘বিবৃতি রাজনীতি’
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যখন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দেশ উত্তাল, তখনও গণপূর্তের বিভিন্ন কর্মকর্তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়।
অভিযোগ রয়েছে, মাসুদ রানা ও তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা ‘বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ’-এর ব্যানারে সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় বিবৃতি দেন। উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন এবং নিজেদের অবস্থান সুরক্ষিত রাখা—এমন দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।
কিন্তু ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এরপরই শুরু হয় পুরোনো অবস্থান আড়াল করে নতুন পরিচয় প্রতিষ্ঠার দৌড়।
‘গুপ্ত’ থেকে ‘উন্মুক্ত’—পরিচয় বদলের অভিযোগ
৫ আগস্টের পর নতুন প্রশাসনিক বাস্তবতায় মাসুদ রানা নিজেকে দীর্ঘদিনের ‘গুপ্ত’ ও ‘সুপ্ত’ বিরোধী শক্তির অংশ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন—এমন অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, নিজেকে আওয়ামী লীগবিরোধী ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার অনুগত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তিনি এক সহকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখেন। ওই সহকর্মীকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য, প্রশাসনিক নথি এবং তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা প্রয়োজন।
এবার নতুন সরকারের ‘আত্মীয়’?
অভিযোগের সর্বশেষ অধ্যায়ে উঠে এসেছে ঢাকা-৭ আসনের এমপি ও বর্তমান প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রহমান হাবিবের নাম।
অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তনের পর মাসুদ রানা কৌশলে প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রহমান হাবিবের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং একপর্যায়ে তাঁর ‘আত্মীয়’ হিসেবেও পরিচিতি পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
গণপূর্তের এক বরখাস্ত কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, ক্ষমতার কেন্দ্র যেদিকেই ঘুরুক, মাসুদ রানা সেদিকেই নিজের অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম।
প্রশ্ন উঠছে—কার ছত্রচ্ছায়ায় এতদিন?
মাসুদ রানাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—সরকার পরিবর্তনের পরও কীভাবে একই ধরনের বিতর্কিত কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকেন?
তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে কি কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত হয়েছে? বিভিন্ন সময়ে তাঁর পদায়নের পেছনে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক তদবির ছিল কি না, তা কি খতিয়ে দেখা হয়েছে? কথিত কমিশন-বাণিজ্য, ‘সেভিংস’ ভাগাভাগি কিংবা পদায়ন বাণিজ্যের অভিযোগের কোনো আর্থিক বা নথিভিত্তিক অনুসন্ধান হয়েছে কি?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—একাধিক সরকারের আমলে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ থাকা একজন কর্মকর্তার পদায়ন ও সম্পদ-আর্থিক লেনদেন কি কখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে?
গণপূর্ত অধিদপ্তরের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক শুদ্ধতার স্বার্থে এসব প্রশ্নের উত্তর এখন সময়ের দাবি। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অবস্থান পরিষ্কার করাও সমান জরুরি।
কারণ সরকার বদলালেই যদি শুধু চেয়ার বদলায়, কিন্তু একই বিতর্কিত প্রভাববলয় টিকে থাকে—তাহলে কাঙ্ক্ষিত প্রশাসনিক সংস্কার কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে…..
