ঈশ্বরদী উপজেলার লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নের চরকুড়ুলিয়া গনির ঘাটে নির্মাণাধীন সেতু। ছয় বছরেও চালু হয়নি, পাঁচ কিলোমিটার ঘুরে ফসল নিয়ে হাটে যান কৃষকরা। দুর্ভোগে ক্ষোভ বাড়ছে। ফাইল ছবি
সেতু আছে, কিন্তু সেতুতে ওঠার রাস্তা নেই। নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সাড়ে ৭ কোটি টাকার সেই সেতু নির্মাণের ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও দুই পাশে তৈরি হয়নি প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়ক। ফলে মানুষের চলাচলের কাজে আসছে না কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোটি। বরং সেতুটি এখন যেন সংযোগহীন উন্নয়নের এক দৃশ্যমান স্মারক।
এরই মধ্যে উদ্বোধনের আগেই সেতুর বিভিন্ন অংশে দেখা দিয়েছে ফাটল ও ভাঙন। এতে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজে দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণেই সেতুর বিভিন্ন অংশে ফাটল ধরেছে। অথচ এখনও সেতুর দুই পাশে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয়নি।
পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নের চরকুড়ুলিয়া গনির ঘাট এলাকায় পদ্মার শাখা নদীর ওপর নির্মিত সেতুটির এমন দশায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। তাদের দাবি, সেতুর দুই পাশের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিত যোগাযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ছয় বছর ধরে অপেক্ষার পর সেতুটি দাঁড়িয়েছে ঠিকই; কিন্তু তার সঙ্গে দাঁড়ায়নি দুই পাশের যোগাযোগব্যবস্থা। সাড়ে ৭ কোটি টাকার এই সেতু এখন উন্নয়নের প্রতীক হওয়ার বদলে অপূর্ণ কাজের এক দৃশ্যমান স্মারকে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অপেক্ষা—কবে সংযোগ সড়ক হবে, কবে সেতু খুলবে, আর কবে পাঁচ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে না গিয়ে সরাসরি হাট-বাজারে পৌঁছানো যাবে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, চরকুড়ুলিয়া এলাকার কয়েকটি গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমাতে গনির ঘাট এলাকায় পদ্মার শাখা নদীর ওপর ২০২১ সালে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭ কোটি ৪ লাখ ১৩ হাজার ৭৪৯ টাকা। নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় যশোরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আইসিএল প্রাইভেট লিমিটেড।
নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি তিন দফায় সময় বাড়িয়ে নেয়। সময় বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে প্রকল্প ব্যয়ও। শেষ পর্যন্ত সেতু নির্মাণে ব্যয় দাঁড়ায় ৭ কোটি ৪৯ লাখ ৪৯ হাজার ৮৩৩ টাকা।
দীর্ঘদিন ধীরগতিতে কাজ চলার পর সম্প্রতি সেতুর মূল অবকাঠামোর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু সেতু নির্মাণ শেষ হলেও দুই পাশে তৈরি হয়নি প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়ক। ফলে সেতুটি নির্মিত হলেও এর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াতের বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়নি।
সেতুটি চালু না হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। উৎপাদিত ফসল হাট-বাজারে নিতে তাদের বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সময় বেশি লাগছে, অন্যদিকে বাড়ছে পরিবহন খরচ।
স্থানীয় এক কৃষক বলেন, সেতুটি চালু হবে—এই আশায় তারা দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু সেতু নির্মাণের পরও সংযোগ সড়ক না থাকায় আগের দুর্ভোগই রয়ে গেছে।
এদিকে সেতুটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এখনও হয়নি। তার আগেই বিভিন্ন অংশে ফাটল ও ভাঙন দেখা দেওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে নির্মাণকাজের মান নিয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজের শুরু থেকেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। সেতুর বর্তমান অবস্থা দেখে স্থানীয়দের কারও কারও মনে হচ্ছে, এটি যেন বহু বছরের পুরোনো কোনো জরাজীর্ণ স্থাপনা।
স্থানীয়দের দাবি, সেতুটির নির্মাণকাজে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়েছে কিনা, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে নির্মাণকাজের গুণগত মান যাচাই করে দায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং দ্রুত মানসম্মত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে সেতুটি চালু করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যশোরের আইসিএল প্রাইভেট লিমিটেডের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার ফুল মিয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।
এলজিইডি পাবনার নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম বলেন, সেতুটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তাঁরা অবগত আছেন। দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
