ফরেনসিক অডিটে উঠে এসেছে ২৭১৪ কোটি ৭০ লাখ টাকার অনিয়ম-ক্ষতির চিত্র, ভুয়া ভেন্ডর ও অগ্রিম বিল-ভাউচারে লোপাটের অভিযোগ। ফাইল ছবি
প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে আট বছরে প্রায় ২ হাজার ১৫২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে। ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে এসব অর্থ লোপাট করা হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেনসিক অডিটে উঠে এসেছে।
সরাসরি আত্মসাৎ এবং এর ফলে ব্যাংকের পরোক্ষ ক্ষতি মিলিয়ে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭১৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরাসরি আত্মসাতের পরিমাণ ২ হাজার ১৫১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এবং পরোক্ষ ক্ষতি ৫৬৩ কোটি ৪ লাখ টাকা।
ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও অন্যান্য খাতের নির্বাচিত ব্যয়ের ওপর এই নিরীক্ষা চালায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠান এমএবিএস অ্যান্ড জে পার্টনার্স। গত ১২ মার্চ প্রতিষ্ঠানটি ফরেনসিক অডিট প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে পরিকল্পিত ও নিয়মতান্ত্রিক আর্থিক অনিয়মের নানা চিত্র উঠে এসেছে। এর প্রায় পুরোটাই বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ও ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল এবং তাঁর পরিবার-সংশ্লিষ্ট বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুয়া ভেন্ডর সাজিয়ে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
ফরেনসিক অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাগুজে ভেন্ডর সাজিয়ে এবং অগ্রিম বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ভেন্ডরের নামে অগ্রিম হিসেবে দেওয়া প্রায় ১ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা এখনো অনাদায়ি রয়েছে। এসব অর্থের বিপরীতে কোনো পণ্য বা সেবা সরবরাহের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে নিরীক্ষক দল।
কালার ওয়েবের নামে ১৯৩ কোটি, পণ্য সরবরাহ মাত্র ৩১ কোটি টাকার
রাজধানীর পুরানা পল্টনের একটি প্রিন্টিং ও প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠান কালার ওয়েবের নাম ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্টেশনারি ছাপানো ও মুদ্রণ খাতে প্রতিষ্ঠানটির নামে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ১৯৩ কোটি টাকা। অথচ প্রকৃতপক্ষে পণ্য সরবরাহ হয়েছে প্রায় ৩১ কোটি টাকার। অর্থাৎ, বাকি প্রায় ১৬২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে ফরেনসিক অডিট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে কালার ওয়েবের মালিকের সাক্ষাৎকারও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে তিনি জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা দুটি ব্যাংক হিসাবের নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রিমিয়ার ব্যাংকের বনানী শাখার ইনচার্জ সৈয়দ নওশের আলীর হাতে। প্রতি বছর তিনি ১০ থেকে ১২টি ফাঁকা চেক সৈয়দ নওশের আলীর কাছে দিতেন। তবে কোনো অগ্রিম অর্থ তিনি নিজে কখনো গ্রহণ করেননি বলে জানান।
নোমান বশিরের প্রতিষ্ঠানের নামে ৭৪৫ কোটি টাকা অগ্রিম
এককভাবে সবচেয়ে বড় অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ব্যবসায়ী নোমান বশিরের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে।
২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে তাঁর প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে ভেন্ডর হিসেবে অগ্রিম দেওয়া হয়েছে প্রায় ৭৪৫ কোটি টাকা। তবে নিরীক্ষায় দেখা গেছে, এর বিপরীতে প্রকৃতপক্ষে পণ্য বা সেবা সরবরাহ হয়েছে মাত্র প্রায় ৫০ কোটি টাকার।
নোমান বশিরের প্রতিনিধির ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের ওপরও তাঁর পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইকবাল সেন্টারের ভাড়া নিয়েও শত শত কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগ
প্রভাব খাটিয়ে রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত ইকবাল সেন্টারের জায়গা ব্যাংকের কাছে উচ্চমূল্যে ভাড়া দিতে বাধ্য করা হয় বলে ফরেনসিক অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় এই ভবনেই অবস্থিত। আর ভবনটির মালিক এইচবিএম ইকবাল নিজেই।
বাজারদরের তুলনায় বহুগুণ বেশি ভাড়া, কাল্পনিক ফ্লোর স্পেস এবং অস্বাভাবিক ইউটিলিটি বিলের মাধ্যমে ব্যাংকের সরাসরি ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪০৬ কোটি টাকা। পাশাপাশি পরোক্ষ ক্ষতি হয়েছে আরও প্রায় ২০২ কোটি টাকা।
বিজ্ঞাপন ও প্রচারণায় ১২৯ কোটি টাকার অনিয়ম
প্রচারণা ও বিজ্ঞাপন খাতে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ২৯৭ কোটি টাকা। এর বিপরীতে প্রকৃত সেবা পাওয়া গেছে প্রায় ১৬৮ কোটি টাকার। অর্থাৎ, এ খাতে প্রায় ১২৯ কোটি টাকার অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে নিরীক্ষায়।
এ ছাড়া করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর খাতে প্রায় ১২৬ কোটি টাকার অনিয়ম এবং বিনোদন ব্যয়ের নামে প্রায় ২১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
আরএফসিডি হিসাবে ১৫ লাখ ৭২ হাজার ডলার জমার অভিযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতিমালা লঙ্ঘন করে এইচবিএম ইকবাল ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা আরএফসিডি হিসাবে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা জমা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এইচবিএম ইকবাল, ইমরান ইকবাল, মঈন ইকবাল ও নাওরিন ইকবালের নামে থাকা চারটি পৃথক হিসাবে অনিয়মিতভাবে প্রায় ১৫ লাখ ৭২ হাজার ডলার জমা হয়েছে। এসব অর্থ জমার পক্ষে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে নিরীক্ষক দল।
বিদেশ ভ্রমণের ক্রেডিট কার্ডের ব্যয়ও আরএফসিডি হিসাবে সমন্বয়
বিদেশ ভ্রমণের সময় একাধিক ক্রেডিট কার্ডে করা ব্যয়ের অর্থ পরবর্তী সময়ে আরএফসিডি হিসাবের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়েছে বলেও ফরেনসিক অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এইচবিএম ইকবাল, ইমরান ইকবাল, মঈন ইকবাল, নাওরিন ইকবাল ও ইয়াসনা পূজা ইকবালের নামে থাকা একাধিক ক্রেডিট কার্ডে এভাবে প্রায় ১৯ লাখ ৬২ হাজার ডলার ব্যয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার সুযোগে দীর্ঘদিনের অনিয়ম
ফরেনসিক অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি কাঠামোর একাধিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়ম চালানো সম্ভব হয়েছে।
প্রতিবেদনে উঠে আসা এসব তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট অর্থের ব্যবহার, দায়-দায়িত্ব এবং ব্যাংকের ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও তদন্ত ও যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে।
