মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজে দায়িত্ব নিয়ে জটিলতা, একই কক্ষে দুই অধ্যক্ষ। ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজে একই সময়ে দুই ব্যক্তি নিজেকে অধ্যক্ষ দাবি করায় চরম প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। কে বৈধ অধ্যক্ষ—এ নিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে যেমন বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তেমনি ব্যাহত হচ্ছে কলেজের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম। দুপক্ষই নিজেদের অবস্থানের বৈধতা দাবি করায় দাপ্তরিক নথিতে স্বাক্ষর, প্রশাসনিক নির্দেশনা ও দায়িত্ব পালন নিয়েও তৈরি হয়েছে জটিলতা।
এ পরিস্থিতির মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে গভর্নিং বডির মাধ্যমে দায়িত্ব পাওয়া অধ্যক্ষ অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল শহীদুল হাসানকে অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। দুপুর পর্যন্ত এ বিক্ষোভ চলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কলেজের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
কলেজ-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অধ্যক্ষের পদ নিয়ে বিরোধের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিক্ষক-কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে বিভাজনের আশঙ্কার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম কয়েক মাস আগে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল শহিদুল হাসানকে চুক্তিভিত্তিক অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় গত ২০ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইডেন মহিলা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক সুফিয়া আখতারকে মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে পদায়ন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
অধ্যাপক সুফিয়া আখতার বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের ১৪তম ব্যাচের কর্মকর্তা। মন্ত্রণালয়ের আদেশে তাঁকে গত ২৭ আগস্টের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যথায় ওই দিন অপরাহ্নে তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত করা হয়েছে বলে গণ্য করার কথা বলা হয়।
সরকারের এ সিদ্ধান্তের পরই শুরু হয় জটিলতা। সুফিয়া আখতার কলেজে গিয়ে যোগ দিলেও গভর্নিং বডির সভাপতি তাঁর যোগদানপত্র গ্রহণ করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, চুক্তিভিত্তিক অধ্যক্ষ শহিদুল হাসানও দায়িত্ব বুঝিয়ে দেননি।
ফলে একই অধ্যক্ষের কক্ষে দুজনই নিয়মিত অফিস করছেন। শহিদুল হাসান অধ্যক্ষের চেয়ারে বসে দায়িত্ব পালন করছেন, আর সুফিয়া আখতার সামনের সোফায় বসে দাপ্তরিক কাজ করছেন। এতে কলেজের প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে।
জানতে চাইলে অধ্যাপক সুফিয়া আখতার সমকালকে বলেন, ‘আমি সরকারি নির্দেশে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পেয়ে কলেজে আসছি। কিন্তু নানা অজুহাতে আমাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, ‘কলেজ কর্তৃপক্ষ শহিদুল হাসানকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছিল। ওই নিয়োগপত্রে শর্ত ছিল, সরকার কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করলে কিংবা নতুন অধ্যক্ষ নিয়োগ দিলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল বলে গণ্য হবে। ফলে সরকার তাঁকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পরই আগের অধ্যক্ষের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে।
শহিদুল হাসান বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমিও বিব্রত। গভর্নিং বডির সভাপতির (ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক) সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছি। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের বিষয়টি তাঁকে জানিয়েছি। আমি এখান থেকে চলে যাওয়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত পাইনি; পেলে চলে যাব।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রহমতুল্লাহ বলেন, ‘গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি শর্ত ছিল, সরকার কাউকে দায়িত্ব দিলে চুক্তি বাতিল হবে। সেই অনুযায়ী শহিদুল হাসানের চুক্তি বাতিল হয়েছে। কিন্তু তিনি যাচ্ছেন না। আমরা বড় সমস্যায় আছি। দুই অধ্যক্ষ এক রুমে বসছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। এর একটা বিহিত করা প্রয়োজন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার পর দুই অধ্যক্ষ, ছাত্র প্রতিনিধি, শিক্ষক ও একজন অভিভাবক প্রতিনিধি বৈঠকে বসেন। বৈঠকে আগামী রোববার গভর্নিং বডির সভা ডাকার সিদ্ধান্ত হয়।
ওই সভায় অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতা নিয়ে আলোচনা হবে এবং সেখানে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়।
এদিকে, একই কলেজে একই সময়ে দুই অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন এবং তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কার্যক্রম ও একাডেমিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এখন রোববারের গভর্নিং বডির সভার সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা।
