বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পরিচালক (ক্রয় ও সংরক্ষণ) এ. কে. এম. আরিফ উদ্দিনকে ঘিরে নতুন করে অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এর আগে নারীকাণ্ডে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া এই কর্মকর্তার পুনর্বহাল ও গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন নিয়ে বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার তাঁর বিরুদ্ধে ই-জিপি দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ১৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবি, একযোগে আটটি দরপত্র বাতিল এবং একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দুই বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করার অভিযোগ সামনে এসেছে।
বিআইডব্লিউটিএর তালিকাভুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এফ.ডি. ইন্টারন্যাশনাল’-এর স্বত্বাধিকারী মো. সাগর আহমেদ আকিব এসব অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, অনৈতিক আর্থিক সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অভিযোগের বিষয়গুলো সত্য হলে তা সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অবাধ প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করবে।
১৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ, পরদিনই বাতিল আট দরপত্র
অভিযোগকারী সাগর আহমেদ আকিবের ভাষ্যমতে, বিআইডব্লিউটিএর আহ্বান করা টেন্ডার আইডি ১৩০৪০৭৯, ১৩০৪০৭৪, ১৩০৩৬৬০, ১৩০৩৫৩০, ১৩০৩৫১৭, ১৩০৩৫০৩ ও ১৩০৩৫৩২-সহ মোট আটটি ই-জিপি দরপত্রে অংশ নেয় তাঁর প্রতিষ্ঠান। তাঁর দাবি, দরপত্রের সব শর্ত পূরণ করে প্রতিষ্ঠানটি সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে পরিচালক এ. কে. এম. আরিফ উদ্দিন তাঁকে নিজ দপ্তরে ডেকে পাঠান। সেখানে কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন আকিব। তিনি ওই অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পরদিন, অর্থাৎ ২০ আগস্ট, তাঁর প্রতিষ্ঠানের অংশ নেওয়া আটটি দরপত্রই বাতিল করে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়।
আকিবের অভিযোগ, দরপত্র বাতিলের পেছনে কোনো গ্রহণযোগ্য কারিগরি, দাপ্তরিক কিংবা আইনগত কারণ তাঁকে জানানো হয়নি। তাঁর দাবি, ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানানোর প্রতিশোধ হিসেবেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শো-কজ ছাড়াই দুই বছরের কালো তালিকাভুক্তি!
দরপত্র বাতিলের পাশাপাশি এফ.ডি. ইন্টারন্যাশনালকে দুই বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারী সাগর আহমেদ আকিবের দাবি, কোনো ধরনের কারণ দর্শানোর নোটিশ (শো-কজ) না দিয়েই তাঁর প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ হারিয়ে মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
এ ছাড়া ‘স্পিডি গ্রুপ’ নামের একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে কাজ পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাঁর প্রতিষ্ঠানের সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়া দরপত্রগুলো বাতিল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন আকিব।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দরপত্রের মূল্যায়ন প্রতিবেদন, তুলনামূলক বিবরণী, দরপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত, কালো তালিকাভুক্তির লিখিত আদেশ এবং অন্যান্য দাপ্তরিক নথি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানের দাবি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথিপত্র যাচাই ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
তারপরও সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি করা একটি প্রতিষ্ঠানের আটটি দরপত্র একযোগে বাতিল এবং পরবর্তীতে দুই বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্তির অভিযোগ সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া ও ই-জিপি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ তৈরি করেছে।
নারীকাণ্ডে বরখাস্ত, পুনর্বহাল কীভাবে?
পরিচালক এ. কে. এম. আরিফ উদ্দিনকে ঘিরে বর্তমান বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর আগের সাময়িক বরখাস্ত ও পুনর্বহালের ঘটনাও।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক নারীর সঙ্গে তাঁর আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। ‘বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ১৯৯০’-এর ৩৫(খ) ও ৩৫(ঙ) বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রবিধানমালার ৪১(১) বিধি অনুযায়ী চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরে তাঁর বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বরখাস্ত থাকা অবস্থায় নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে দাপ্তরিক দায়িত্ব থেকে বিরত রেখে প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগে হাজিরার শর্তে খোরাকি ভাতা দেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু পরবর্তীতে কোন প্রক্রিয়ায় কিংবা কী ধরনের প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে তাঁর বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে পুনর্বহালের পর সরাসরি ‘ক্রয় ও সংরক্ষণ’ বিভাগের মতো স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ পরিচালকের পদে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি সংস্থার ভেতরে-বাইরে নানা আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, এমন একজন বিতর্কিত কর্মকর্তার অধীনে গুরুত্বপূর্ণ ক্রয়প্রক্রিয়া পরিচালিত হওয়ায় দরপত্রের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি, দুদকের হস্তক্ষেপ চান ঠিকাদার
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় এফ.ডি. ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী সাগর আহমেদ আকিব সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও অবাধ প্রতিযোগিতার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।
তিনি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের জোর দাবি জানিয়েছেন।
বিআইডব্লিউটিএর মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় ক্রয় বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আটটি দরপত্র বাতিল, ঘুষ দাবির অভিযোগ, কালো তালিকাভুক্তির সিদ্ধান্ত এবং পরিচালকের পুনর্বহাল—প্রতিটি বিষয় সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথির ভিত্তিতে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে পরিচালক এ. কে. এম. আরিফ উদ্দিনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এমনকি বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান, পরিচালক (প্রশাসন) এস. এম. শাহেদ রেজা, সংশ্লিষ্ট ক্রয় কর্মকর্তা কিংবা অভিযোগে নাম আসা ‘স্পিডি গ্রুপ’-এর পক্ষ থেকেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, দরপত্রের নথিপত্র এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিস্তারিত পর্যালোচনা ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তবে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এখন সময়ের দাবি।
বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে…
