৪০০ কোটি টাকার করভবন প্রকল্প ঘিরে প্রশ্ন, এনডিইর সঙ্গে কথিত যোগসাজশ ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ—থামছে না বিতর্ক। ফাইল ছবি
চট্টগ্রাম গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভাগ-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসানকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। প্রায় ৫০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ, দেশের শীর্ষস্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এনডিই)-এর সঙ্গে কথিত যোগসাজশ এবং প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ের করভবন নির্মাণ প্রকল্পে তাঁর পদায়ন—সব মিলিয়ে নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছেন এই প্রকৌশলী। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ঠিকাদারি স্বার্থের প্রভাব, দরপত্রের স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।
তবে অভিযোগের বিপরীতে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ বা আদালতের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অনিয়ম চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন না করে নথিপত্র, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা জরুরি।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রশ্নের মুখে প্রকল্প ও দরপত্র
গণপূর্ত অধিদপ্তরের দাপ্তরিক রেকর্ডপত্র অনুযায়ী, মো. মেহেদী হাসান ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পর ওই বিভাগে কোন কোন মেগা প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে নির্বাচিত হয়েছে, দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল এবং কার্যাদেশ ও সরকারি বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) তথা সরকারি ক্রয়বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় নিয়ে নানা মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশেষ করে তাঁর দায়িত্বাধীন সময়ে কোনো নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অযৌক্তিক বা একচ্ছত্র সুবিধা পেয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দরপত্রের নথি, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ, কার্যাদেশ, বিল অনুমোদন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সচেতন মহল।
৪০০ কোটি টাকার করভবন প্রকল্প: পদায়নের নেপথ্যে কী?
প্রকৌশলী মেহেদী হাসানের চট্টগ্রামে পদায়ন প্রক্রিয়া নিয়েও অতীতে নানা গুঞ্জন শোনা গেছে। প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ের অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও গুরুত্বপূর্ণ করভবন নির্মাণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে তাঁর এই নির্দিষ্ট বিভাগে পদায়নের পেছনে কোনো ঠিকাদারি স্বার্থ কিংবা বিশেষ তদবির কাজ করেছে কি না, সেই প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, প্রকল্পটির গুরুত্ব ও বিপুল অর্থ বরাদ্দের কারণে সংশ্লিষ্ট বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পদায়ন প্রক্রিয়ায় কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর প্রভাব ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তবে পদায়নসংক্রান্ত সরকারি আদেশ, প্রশাসনিক নোটশিট, প্রস্তাব এবং দাপ্তরিক ফাইলপত্র যাচাই ছাড়া এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। একইভাবে প্রকৌশলীর রাজনৈতিক বা পারিবারিক পরিচিতি নিয়ে জনমনে যে আলোচনা রয়েছে, তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি আছে কি না, তা নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
৫০ লাখ টাকার কথিত ঘুষ লেনদেন: অভিযোগের কেন্দ্রে মেহেদী
সাম্প্রতিক বিতর্কের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় প্রায় ৫০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের কথিত অভিযোগ। অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনডিইকে ঘিরে অতীতে তৈরি হওয়া বিভিন্ন জটিলতা ও অনিয়মের অভিযোগ সামাল দিতে কিংবা ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে মন্ত্রণালয় পর্যায়ে উচ্চপর্যায়ের তদবিরের চেষ্টা করা হয়েছিল।
অভিযোগে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসানের প্রত্যক্ষ ভূমিকা এবং ৫০ লাখ টাকার আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট ব্যাংকিং রেকর্ড, অর্থের উৎস ও গতিপথ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বৈঠক কিংবা যোগাযোগের প্রমাণ প্রকাশ্যে না আসায় বিষয়টিকে এখনই নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই।
এত বড় অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে আর্থিক লেনদেনের নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগের তথ্য এবং দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তই প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের নির্ভরযোগ্য পথ।
এনডিইকে ঘিরে পুরোনো বিতর্ক, নতুন করে আলোচনায়
আলোচনায় আসা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনডিইকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। অতীতে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির বড় অঙ্কের সরকারি কাজ পাওয়া, দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার এবং রাজনৈতিক লবিং ব্যবহারের অভিযোগ উঠে এসেছে। যদিও এনডিই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেদের প্রকৌশলগত সক্ষমতা ও স্বচ্ছতার কথা দাবি করে আসছে।
অতীতে জাল ও ভুয়া নথিপত্র ব্যবহারের অভিযোগে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর কর্তৃক এনডিইকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিষিদ্ধ করার তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়ে ওই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আইনি স্থগিতাদেশ লাভ করে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া ২০২৪ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে সওজের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য চাপ সৃষ্টির অভিযোগও উঠে আসে। তবে এসব অভিযোগের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণে আদালতের নথি, প্রশাসনিক আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কোনো অভিযোগ বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে একতরফাভাবে অপরাধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা সমীচীন নয়।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের পুরোনো ঘটনাও আলোচনায়
এনডিইকে ঘিরে চট্টগ্রাম কাস্টমসের একটি পুরোনো ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২১ সালে প্রকাশিত সংবাদে জাল মানসনদ ব্যবহার করে নিম্নমানের আমদানি করা বিটুমিন খালাসের অভিযোগে এনডিইকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা জরিমানার তথ্য উঠে এসেছিল। তৎকালীন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ওই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
এ ছাড়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে এনডিইর অংশগ্রহণ এবং একটি প্রকল্পে প্রায় ৯৮ কোটি টাকার সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির সুপারিশ পাওয়ার তথ্যও সামনে এসেছে।
এসব ক্ষেত্রে দরপত্রের নোটিশ, অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তালিকা, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ এবং চুক্তিপত্র পর্যালোচনা করলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় ছিল কি না, তা যাচাই করা সম্ভব। একই সঙ্গে কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও নথিভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি প্রকৌশলী ও এনডিই কর্তৃপক্ষের
উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনডিই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁরা কেউই ফোন রিসিভ করেননি।
ফলে এ বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হবে।
তদন্তের দাবি জোরালো, প্রশ্নের মুখে সরকারি অর্থের স্বচ্ছতা
সব মিলিয়ে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার করভবন নির্মাণ প্রকল্পে পদায়ন, প্রকৌশলী মেহেদী হাসানের বর্তমান কর্মকাণ্ড, এনডিইকে ঘিরে পুরোনো বিতর্ক এবং নতুন করে ওঠা ৫০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ—সবকিছুই একটি গভীর ও বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনার দাবি রাখে।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে জনগণের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। তাই প্রকল্পের দরপত্র, কার্যাদেশ, বিল অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, জনস্বার্থেরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি ভিত্তিহীন বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের মাধ্যমে কোনো কর্মকর্তার পেশাগত সম্মান ক্ষুণ্ন করাও কাম্য নয়।
এ কারণে সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্ত পরিচালনার দাবি জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে কথিত ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের আর্থিক সূত্র, পদায়ন প্রক্রিয়ার নেপথ্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর দরপত্র ও বিল অনুমোদনের নথি যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত ভিত্তি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করে কি না এবং তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে। অভিযোগের সত্যতা, সংশ্লিষ্টদের দায় কিংবা নির্দোষিতা—সবকিছুই নির্ধারিত হওয়া উচিত প্রমাণ, নথি ও নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে।
বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে……..…
