শনিবার, ৭ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

জাল স্বাক্ষরে সরকারি চাল উত্তোলন, সাভার উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা মোজাম্মেল হককে ঘিরে বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক
নভেম্বর ৭, ২০২৬ ১:৫২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

একাধিক মন্দির কমিটির সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে চাল আত্মসাতের অভিযোগ, ভুল স্বীকার করে সাংবাদিকদের কাছে ক্ষমা; সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে অর্থ দিয়ে ম্যানেজের চেষ্টার অভিযোগ। ফাইল ছবি

ঢাকার সাভার উপজেলার আশুলিয়ায় দুর্গাপূজার মণ্ডপে সরকারি বরাদ্দের চাল বিতরণকে কেন্দ্র করে স্বাক্ষর জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, একাধিক মন্দির কমিটির সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে তাঁদের নামে বরাদ্দ করা সরকারি চাল উত্তোলন করা হয়েছে। এ ঘটনায় স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগের পক্ষে কিছু নথিপত্রও পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

অভিযোগের মুখে নিজের ভুল স্বীকার করে সাংবাদিকদের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়েছেন কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর ঘটবে না বলেও আশ্বস্ত করেছেন তিনি। তবে ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ না করতে একই কার্যালয়ের একজন সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও সেই চেষ্টা সফল হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, দুর্গাপূজার ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে মন্দির কমিটির সভাপতিদের সম্মতি ও স্বাক্ষর ছাড়াই তাঁদের নামে বরাদ্দ করা চাল উত্তোলনের ঘটনা ঘটে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ক্ষুব্ধ মন্দির কমিটির নেতারা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

অভিযোগের তালিকায় রয়েছে আশুলিয়ার বাইপাইল বসুন্ধরা গুরুদয়াল দুর্গামন্দির, শিমুলিয়া নৈহাটি সরকারবাড়ি দুর্গামন্দির, জামগড়া বেড়ন মহামায়া সার্বজনীন দুর্গামন্দির এবং নরসিংহপুর সার্বজনীন দুর্গামন্দির। এসব মন্দিরের মধ্যে গুরুদয়াল দুর্গামন্দিরের সভাপতি সম্ভু চন্দ্র সরকার এবং জামগড়া বেড়ন মহামায়া সার্বজনীন দুর্গামন্দিরের সভাপতি প্রদীপ কুমারসহ আরও কয়েকজনের স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ সামনে এসেছে।

ভুক্তভোগী মন্দির কমিটির সভাপতি সম্ভু চন্দ্র সরকার ও প্রদীপ কুমার জানান, দুর্গাপূজা চলাকালে মণ্ডপের বিভিন্ন আয়োজন ও আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে তাঁরা ব্যস্ত ছিলেন। এ সময় উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে তাঁদের বরাদ্দের চাল উত্তোলনের বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়।

তাঁদের ভাষ্য, পূজার ব্যস্ততার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে চাল উত্তোলন করা সম্ভব নয় বলে তাঁরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জানিয়েছিলেন। পূজা শেষে কার্যালয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষর করে বরাদ্দের চাল নিয়ে আসবেন বলেও জানিয়েছিলেন তাঁরা। তখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তাঁদের আশ্বস্ত করেছিলেন বলে দাবি করেন মন্দির কমিটির সভাপতিরা।

কিন্তু পূজা শেষ হওয়ার পর বরাদ্দের চাল উত্তোলনের বিষয়ে যোগাযোগ করতে গেলে তাঁদের নতুন করে স্বাক্ষর দেওয়ার প্রয়োজন নেই বলে কার্যালয় থেকে জানানো হয়। এতে সন্দেহ তৈরি হলে তাঁরা জানতে পারেন, তাঁদের স্বাক্ষর ব্যবহার করে ইতোমধ্যে বরাদ্দের চাল উত্তোলন করা হয়েছে। এমনকি উত্তোলন করা চাল বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা।

মন্দির কমিটির সভাপতিদের দাবি, তাঁদের অনুমতি ছাড়া সরকারি বরাদ্দের চাল উত্তোলনে স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়ে থাকলে তা গুরুতর অনিয়ম ও জালিয়াতির শামিল। এ ঘটনায় তাঁরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

ভুল স্বীকার করে ক্ষমা, তবু প্রশ্নের মুখে কর্মকর্তা

অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে সাভার উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে গিয়ে কর্মকর্তা মোজাম্মেল হকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন সাংবাদিকরা। এ সময় তিনি প্রথমে বিভিন্ন অজুহাত দেখান। একপর্যায়ে নিজের ভুল স্বীকার করে সাংবাদিকদের সামনে হাতজোড় করে ক্ষমা চান। ভবিষ্যতে এ ধরনের ভুল আর হবে না বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।

তবে তাঁর এই ক্ষমা প্রার্থনার পরও স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগের প্রকৃত ঘটনা, সরকারি চাল উত্তোলনের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। কর্মকর্তার ভুল স্বীকারের বিষয়টি অভিযোগের তদন্তের বিকল্প হতে পারে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে অর্থ দিয়ে ম্যানেজের চেষ্টা!

এদিকে, ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ না করতে একই কার্যালয়ের একজন সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে সাংবাদিকরা সেই প্রস্তাবে সাড়া দেননি। সরকারি বরাদ্দের চাল নিয়ে ওঠা অভিযোগের তথ্য অনুসন্ধান ও সংবাদ প্রকাশের দায়িত্ব পালনে তাঁরা অনড় থাকেন।

ইউএনওর বক্তব্য পাওয়া যায়নি

ঘটনার বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে তাঁর কার্যালয়ে গিয়েও বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

সরকারি বরাদ্দের চাল উত্তোলনে মন্দির কমিটির সভাপতিদের স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা কেবল দাপ্তরিক অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত দায়ও তৈরি হতে পারে। তাই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বরাদ্দসংক্রান্ত মূল নথি, চাল উত্তোলনের রেজিস্টার, বিতরণসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বাক্ষর পরীক্ষা করার দাবি উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সাভার উপজেলা প্রশাসন, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে কোন মন্দিরের নামে কত পরিমাণ চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, কারা তা উত্তোলন করেছেন এবং প্রকৃতপক্ষে মন্দির কমিটিগুলো চাল পেয়েছে কি না—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

সরকারি বরাদ্দের চাল বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগের সুষ্ঠু নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।