খাদ্যে বিষক্রিয়ার আশঙ্কা; তারেক মিয়া ও সাব্বির মিয়ারং লাশ দেশে ফেরাতে সরকারের সহায়তা চাইল পরিবার
বিদেশের মাটিতে জীবিকার সন্ধানে পাড়ি দিয়েছিলেন বাবা। কিছুদিন পর একমাত্র ছেলেকেও নিয়ে গিয়েছিলেন পাশে রাখবেন বলে। কিন্তু সেই স্বপ্নের প্রবাসজীবন শেষ হলো এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডিতে। তুরস্কে রহস্যজনক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাবা-ছেলে—একই কক্ষে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় তাদের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
বুধবার সকালে তুরস্কের কুর্দিস্তান অঞ্চলের আরবিল এলাকায় একটি প্লাস্টিক কোম্পানির আবাসিক কক্ষ থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার মেড্ডা গ্রামের বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া, চলছে কান্না আর আহাজারি।
মৃতরা হলেন মেড্ডা গ্রামের মৃত ইয়াকুব মিয়ার ছেলে তারেক মিয়া (৪৫) এবং তাঁর একমাত্র ছেলে সাব্বির মিয়া (২২)। একই ঘটনায় গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তাদের স্বজন লিটন মিয়া (২৬)। এছাড়া ফেনীর এক যুবকও মারা গেছেন বলে জানা গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, খাদ্যে বিষক্রিয়ায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৬ বছর আগে জীবিকার সন্ধানে তুরস্কে পাড়ি জমান তারেক মিয়া। সেখানে আরবিল এলাকার একটি প্লাস্টিক কোম্পানিতে কাজ করতেন তিনি। প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর চার বছর আগে প্রবাসে থাকাবস্থায় ভিডিও কলে দ্বিতীয় বিয়ে করেন পারভিন আক্তারকে। দুই বছর আগে তিনি একমাত্র ছেলে সাব্বিরকেও তুরস্কে নিয়ে যান।
সাব্বিরের দেশে রয়েছে স্ত্রী ও মাত্র এক বছর বয়সী একটি শিশু সন্তান। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে নিরন্তর সংগ্রাম করা সেই বাবা-ছেলের প্রবাসজীবন শেষ হলো হঠাৎই এক অজানা বিপর্যয়ে।
স্বজনরা জানান, মঙ্গলবার রাতে কোম্পানির কাজ শেষে বাবা-ছেলেসহ পাঁচজন একসঙ্গে রাতের খাবার খান এবং নিজ নিজ কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন। কিন্তু পরদিন সকালেও তাদের কোনো সাড়া না পেয়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে। পরে তাদের অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক বাবা-ছেলেকে মৃত ঘোষণা করেন।
তারেক মিয়ার সহকর্মীদের বরাত দিয়ে পরিবারের সদস্যরা জানান, তুর্কি পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে খাদ্যে বিষক্রিয়ায় তাদের মৃত্যু হয়েছে। ইতোমধ্যে স্থানীয় হাসপাতালে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।
এদিকে এই মর্মান্তিক সংবাদ দেশে পৌঁছানোর পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেড্ডা গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা ভিড় করছেন তাদের বাড়িতে, কিন্তু শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না কেউই।
এদিকে মৃত তারেক মিয়ার দ্বিতীয় স্ত্রী পারভিন আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার বাবা-ভাই কেউ বেঁচে নেই। এখন স্বামী আর সন্তানও চলে গেল। আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম। আমার ছেলের এক বছরের একটি শিশু আছে—তার ভবিষ্যৎ কী হবে?
তিনি আরও বলেন, আমার স্বামীর প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর মোবাইল ফোনে আমাদের বিয়ে হয়েছিল। আমি আজ পর্যন্ত তাকে সরাসরি দেখতেও পারিনি। সরকারের কাছে আমার একটাই দাবি—স্বামী ও সন্তানের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়। আমি তাদের শেষবারের মতো নিজের চোখে দেখতে চাই।
প্রবাসের দূর আকাশে নিভে যাওয়া দুটি প্রাণ—একজন বাবার, আরেকজন সন্তানের। আর দেশে পড়ে থাকা স্বজনদের বুকভরা কান্না যেন থামছেই না…
