জ্বালানির বাজার অস্থির করা যুদ্ধে নতুন করে ইস্যু হচ্ছে ইরানের খার্গ দ্বীপ। ছবি: এএফপি
চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশিত দুটি খবর ইরান যুদ্ধে নতুন মোড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রথমটি ইরানের পক্ষ নিয়ে হুতি বিদ্রোহীদের যুদ্ধে যোগ দেওয়ার ঘোষণা এবং দ্বিতীয়টি মধ্যপ্রাচ্যে আরও ১০ হাজার মার্কিন সৈন্য মোতায়েনের প্রস্তুতি।
এ দুটি খবরই এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার কথা বলছেন। ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে সম্ভাব্য হামলার সময়সীমা ১০ দিন পিছিয়েও দিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, আলোচনার কথা বলে ট্রাম্প মূলত সেনা মোতায়েনের জন্য যথেষ্ট সময় অর্জন করতে চাইছেন। এই প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে তিনি খার্গ দ্বীপ দখলের অনুমতি দিতে পারেন।
আপাতদৃষ্টিতে খার্গ দ্বীপ দখলে ট্রাম্পের বাসনা প্রকট হয়েছে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর। ২২ মাইল প্রশস্ত এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয়। অপরদিকে ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির মূল কেন্দ্র খার্গ দ্বীপটিও হরমুজ থেকে প্রায় ৩০০ মাইল দূরে। ধারণা করা হচ্ছে, হরমুজ বন্ধ করে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে তেহরানের চেষ্টা রুখে দিতে খার্গ দ্বীপ দখল করতে চান ট্রাম্প। যেটি তিনি কয়েক দশক আগে থেকে দখলে নেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছেন।
অর্থ্যাৎ, আকাশ পথে প্রায় হারতে বসা যুদ্ধে জয় নিশ্চিত করতে; ট্রাম্প এখন স্থল অভিযানের মাধ্যমে সম্ভবত তাঁর কয়েক দশক আগের ভাবনা বাস্তবায়নকে বিকল্প কৌশল হিসেবে নির্ধারণ করতে যাচ্ছেন।
৩০ বছরের বাসনা
খার্গ দ্বীপ দখল করতে ট্রাম্প প্রকাশ্যে প্রথমবার হুমকি দিয়েছিলেন ১৯৮৮ সালে। তখনও তিনি রাজনীতিতে আসেননি। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে। ৩০ বছর আগের ওই সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘সুযোগ পেলে আমি ইরানের প্রতি কঠোর হবো। তারা আমাদের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিকভাবে জয়ী হচ্ছে। আমাদের বোকা হিসেবে তুলে ধরছে। আমাদের কোনো একজন লোক বা জাহাজে যদি একটা গুলিও ছোঁড়া হয়, তবে আমি খার্গ দ্বীপ তছনছ করে দেব। আমি সেখানে ঢুকে দ্বীপটি দখল করে নেব।

দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১৯৮৮ সালের সাক্ষাৎকার। স্ক্রিনশট
ওই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও বলেছিলেন, ‘ইরান তো ইরাককেই হারাতে পারছে না, অথচ তারা যুক্তরাষ্ট্রকে নাকানিচুবানি খাওয়াচ্ছে। তাদের মোকাবিলা করাটা বিশ্বের জন্যই মঙ্গলজনক হবে।’
চলমান যুদ্ধে ইরান যখন মধ্যেপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি তছনছ করছে, তখন ট্রাম্প যেন তাঁর ৩০ বছর আগের বলা কথাটাই বাস্তবায়ন করতে চাইছেন। এখন প্রশ্ন হলো, এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে গেলে ট্রাম্পকে ঠিক কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে? এর উত্তরে বিশ্লেষকরা বলছেন, আকাশ পথের অভিযানের মতো সম্ভাব্য স্থল অভিযানও ইরানের কড়া পাল্টা জবাবের মুখে পড়বে।
দ্বীপ দখলই যুদ্ধের মূল লক্ষ্য?
ইরানের মূল ভূখণ্ডের উপকূল খুব বেশি গভীর নয়। ফলে সেখানে বড় আকারের ট্যাঙ্কার নোঙর করতে পারে না। বিপরীতে ভূখণ্ড থেকে ১৬ মাইল দূরের খার্গ দ্বীপ সমুদ্রের গভীর অঞ্চলে অবস্থিত। ফলে সেখানেই মোট তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশ কার্যক্রম চলে। এটি দখল করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত করার সক্ষমতা অর্জন করবে।
চলতি মাসের মাঝামাঝিতে মার্কিন বাহিনী খার্গ দ্বীপে সিরিজ হামলা চালায়। তখন ট্রাম্প বলেছিলেন, সেখানে থাকা সমস্ত সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে। পরবর্তী ধাপে তেল অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হবে।
সম্প্রতি দ্য টেলিগ্রাফ ও রয়টার্সকে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন এখন খার্গ দ্বীপে স্থলবাহিনী পাঠানোর বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে। গত ৮ মার্চ হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা ও ন্যাশনাল এনার্জি ডমিনেন্স কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক জ্যারড এজেন ফক্স বিজনেসকে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলেও যুক্তরাষ্ট্র খুব বেশি মাথা ঘামাবে না। তারা ইরানিদের হাত থেকে সমস্ত তেল বের করে আনবে।
এরপরই জ্যারড এজেন বলেন, ‘আমরা ইরানের এই বিশাল তেলের মজুত সন্ত্রাসীদের (বর্তমান শাসনব্যবস্থা) হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে চাই।’
সম্ভাব্য অভিযান ও ঝুঁকি
খার্গ দ্বীপ দখলের সম্ভাব্য অভিযান কেমন হবে সেটির কিছু ইঙ্গিত উঠে এসেছে গত কয়েকদিন ধরে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে। যেমন- সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, চলতি মাসের শেষ নাগাদ মেরিন সেনাদের দুটি দল এই অঞ্চলে পৌঁছাতে পারে। পেন্টাগন কয়েক হাজার এয়ারবোর্ন (প্যারাট্রুপার) সৈন্য পাঠানোর পরিকল্পনাও করছে।

খার্গ দ্বীপে সম্ভাব্য অভিযানের কৌশল। ছবি: দ্য টেলিগ্রাফের সৌজন্যে
টেলিগ্রাফ বলছে, প্রথমে প্যারাট্রুপার দ্বীপে অবতরণ করে বিমানঘাঁটি দখল করবে। এরপর উভচর জাহাজগুলোতে করে মেরিন সেনা, ল্যান্ডিং ক্রাফট নেওয়া হবে। জাহাজ থেকে উপকূলে এবং ট্রুপ এয়ারক্রাফটের মাধ্যমে দ্বীপের ভেতরের ল্যান্ডিং জোনগুলোতে মেরিন সেনা ও সরঞ্জাম পরিবহন করা হবে। এসব কাজ পরিচালনায় সহায়তা করবে বিমানবাহী রণতরী। আর যুদ্ধবিমানগুলো আকাশসীমায় টহল দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য হুমকি প্রতিহত করবে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অভিযানটি অত্যন্ত দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হলেও এটি মার্কিন সেনাদের চরম ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। যুদ্ধও তখন শেষ হওয়ার পরিবর্তে আরও দীর্ঘায়িত হবে। সেটি হলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান পার্টি ও ডোনাল্ড ট্রাম্প বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়বেন।
বৃহস্পতিবার এ নিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসির লং ওয়ার জার্নাল। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্কটির দুই গবেষক রায়ান ব্রবস্ট ও ক্যামেরন ম্যাকমিলান লিখেছেন, খার্গ দ্বীপ দখল করা হলে তা যুদ্ধকে চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে নেওয়ার চেয়ে বরং আরও বিস্তৃত করবে।
এই দুই বিশ্লেষকের মতে, তেহরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে বাধ্য করতে এবং ভবিষ্যৎ আলোচনায় বাড়তি সুবিধা পাওয়ার জন্য খার্গ দ্বীপটিকে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায় ওয়াশিংটন। তবে দ্য টেলিগ্রাফ তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, হরমুজ সচল করতে পার্শবর্তী কেশম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ারও চেষ্টা করতে পারে মার্কিন সেনারা। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপটি থেকে ইরানের শাসকরা হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করে। কারণ এখান থেকে পুরো জলপথটির ওপর নজরদারি করা যায়।
শুক্রবার এক প্রতিবেদনে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিপরীতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে ট্রাম্প প্রশাসন আরও ১০ হাজার সৈন্য মোতায়েনের কথা বিবেচনা করছে। তারা অঞ্চলটিতে মোতায়েন থাকা কয়েক হাজার প্যারাট্রুপার ও মেরিন সেনার সঙ্গে যোগ দেবে।
হুতির প্রস্তুতি কিসের ইঙ্গিত?
সেনা মোতায়েনের মতো পদক্ষেপগুলো যখন খার্গ দ্বীপ দখল অভিযানের গুঞ্জনকে জোরালো করছে, তখনই ইরানের হয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা। ইরান সমর্থিত এই প্রক্সি গোষ্ঠী তেল পরিবহনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বাব এল-মান্দেব নিয়ন্ত্রণ করে।
হরমুজের মতোই সরু এই প্রণালি লোহিত-এডেন উপসাগরকে যুক্ত করেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এ প্রণালি দিয়ে সমুদ্রপথে মোট জ্বালানি চাহিদার ১২ শতাংশ (৮.৮ মিলিয়ন ব্যারেল) পরিবহন হয়। সৌদি আরব ও ইরাকের অপরিশোধিত তেল এই প্রণালি দিয়ে ইউরোপের দিকে যায়।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র খার্গ দ্বীপ অস্থির করলে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার হাতিয়ারও ইরানের হাতে আছে। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বুধবার ইরানের এক কর্মকর্তা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন- ওয়াশিংটন যদি তাদের ভূখণ্ডে স্থল অভিযান চালায়, তবে তেহরান ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সক্রিয় করে লোহিত সাগরের জাহাজে হামলা চালিয়ে প্রতিশোধ নেবে।
ইরান যদি সত্যিই ইউরোপ অভিমুখী তেলবাহী জাহাজগুলোতে হুতিদের দিয়ে হামলা করায়; তাহলে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতের এই যুদ্ধে আরেকটি নতুন রণক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। তেলকেন্দ্রিক যুদ্ধে তখন আরও প্রাণ ঝরবে, জ্বালানি সংকটে ভুগবে বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির দেশগুলো। সার তৈরির উপাদানের ঘাটতিতে বাড়বে খাদ্যপণ্যের দাম।
সূত্র: সমকাল থেকে সংগৃহীত
