বৃহস্পতিবার, ২০শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অনলাইন জুয়ার এজেন্ট শামীম মেহেরপুরে গ্রেপ্তার তিন মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি, মানিলন্ডারিং তদন্তেও নাম—অভিযোগের কেন্দ্রে কোটি কোটি টাকার সম্পদ

মেহেরপুর জেলা প্রতিনিধি
আগস্ট ১৯, ২০২৬ ১১:৫১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

গ্রেপ্তার শামীম রেজা। ছবি: সংগৃহীত

অনলাইন জুয়ার এজেন্ট এবং সাইবার সুরক্ষা আইনে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি শামীম রেজাকে গ্রেপ্তার করেছে মেহেরপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। বুধবার (১৯ আগস্ট) রাত সাড়ে ৭টার দিকে মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার কোমরপুর গ্রামে নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ডিবির একটি সূত্র ও স্থানীয় গ্রামবাসী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

শামীম রেজার বিরুদ্ধে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে মেহেরপুরে দুটি এবং ঢাকার অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডিতে) আরও তিনটি মামলা চলমান রয়েছে। পাশাপাশি সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার তার বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিংয়ের একাধিক অভিযোগ তদন্ত করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

‘গ্রেপ্তার হয়েছে, বিস্তারিত পরে’

শামীমকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে মেহেরপুর জেলা গোয়েন্দা শাখার ওসি প্রদীপ কুমার সানার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি একটি সাক্ষীর কারণে বর্তমানে মেহেরপুরের বাইরে রয়েছি। তবে আমার টিম একজন এজেন্টকে গ্রেপ্তার করেছে—এ কথা শুনেছি। কাকে, কী কারণে এবং কোথা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা তদন্ত ও যাচাই-বাছাই শেষে আগামীকাল অফিসিয়াল প্রেস রিলিজের মাধ্যমে আপনাসহ সব গণমাধ্যমকর্মীকে জানিয়ে দেওয়া হবে।

রাইসমিল থেকে অনলাইন জুয়ার সাম্রাজ্য

এর আগে এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে উঠে আসে শামীম রেজার হঠাৎ আর্থিক উত্থানের চাঞ্চল্যকর তথ্য।

স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধান অনুযায়ী, শামীমের বাবা সাহজুল সর্দার ওরফে বিলু সর্দার ২০০০ সালের দিকে মহাজনপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ৫ থেকে ১০ টাকার বিনিময়ে ভিসিআর দিয়ে সিনেমা প্রদর্শন করতেন। পরে ২০১৬ সালে একটি রাইসমিল স্থাপন করে ব্যবসা শুরু করেন। ওই রাইসমিলের দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন ছেলে শামীম।

প্রায় তিন বছর রাইসমিলের ব্যবসার পর চাচাতো ভাই রাজুর সহযোগিতায় জামান মাস্টার নামে এক ব্যবসায়ীর মাধ্যমে অনলাইন জুয়া পরিচালনার একটি ‘ওয়ান এক্স বেট মাস্টার’ চ্যানেল সংগ্রহ করেন শামীম। আর সেখান থেকেই শুরু হয় তার অনলাইন জুয়ার ব্যবসা।

অভিযোগ রয়েছে, এসব লেনদেন ও অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে জামান মাস্টারের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং পয়েন্ট ব্যবহার করা হতো।

এক বছরের মধ্যেই শামীম আরও দুটি ‘মেল বেট’ চ্যানেলের মালিক হন। এর প্রায় ছয় মাস পর রাশিয়া থেকে পরিচালিত ‘লাইন বেট’-এর সহকারী কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবেও দায়িত্ব পান তিনি। এরপর দ্রুত বাড়তে থাকে তার অনলাইন জুয়ার ব্যবসার পরিধি।

১৪ চ্যানেলের নেটওয়ার্ক?

অবৈধ অনলাইন জুয়া পরিচালনার জন্য নিজস্ব নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে শামীমের বিরুদ্ধে। সাহেবপুর গ্রামের রতনকে ব্যক্তিগত ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার চ্যানেল পরিচালনা শুরু করেন তিনি।

সিআইডির একটি সূত্রের দাবি, সাহেবপুর গ্রামের রতন ও শাহীন বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করে শামীমের কয়েকটি অনলাইন জুয়ার চ্যানেল পরিচালনা করছেন। সূত্রটির দাবি, বর্তমানে শামীমের মোট চ্যানেলের সংখ্যা ১৪টি।

তবে এসব অভিযোগের সবগুলো এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক!

অনলাইন জুয়ার ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার পর অল্প সময়েই শামীমের সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে বলে স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে।

পৈতৃক বাড়ি সংস্কারের পাশাপাশি আরও দুটি বহুতল বাড়ির মালিক হয়েছেন তিনি বলে স্থানীয়দের দাবি। বর্তমানে যে বাড়িতে তিনি বসবাস করেন, সেটির পাইলিং করতেই দুই কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। বাড়িটির নিচে রয়েছে দুই তলা আন্ডারগ্রাউন্ড এবং ওপরে আরও তিন তলা।

বাড়ির পাশের একটি আমবাগানের অর্ধেকও শামীম কিনে নিয়েছেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।

কোমরপুর গ্রামে প্রথম হার্ডওয়্যারের ব্যবসা শুরুর সময় প্রায় দুই কোটি টাকার মালামাল তুলেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এরপর অল্প সময়ের মধ্যে শুধু কোমরপুর গ্রামেই প্রায় ২৫ বিঘা জমি কিনেছেন বলে দাবি এলাকাবাসীর।

এ ছাড়া সাহেবপুর গ্রামে শ্বশুর ও স্ত্রীর নামে বিপুল জমি কেনার অভিযোগও রয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়টি এখনো সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মাদক ও নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ

বিপুল অর্থের মালিক হওয়ার পর শামীম টাকার প্রভাবে এলাকায় মাদক ব্যবসা ও নারী কেলেঙ্কারিতেও জড়িয়ে পড়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কোমরপুর গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, কিছুদিন আগে শামীমের একটি অনলাইন জুয়া চ্যানেলের এক পার্টনারকে অস্ত্র মামলায় ফাঁসিয়ে তার টাকা ও চ্যানেল আত্মসাৎ করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তিনবার অভিযান, ধরাছোঁয়ার বাইরে

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শামীমকে গ্রেপ্তারে মেহেরপুরে তিনবার অভিযান চালিয়েছিল ঢাকার সিআইডি। তবে প্রতিবারই তিনি গ্রেপ্তার এড়িয়ে যান।

স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ নেতা আমাম হোসেন মিলুর ছত্রছায়ায় থাকার কারণে প্রতিবারই শামীম রক্ষা পেয়েছেন। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই তিনি খোলস পাল্টে ভিন্ন মতাদর্শের একজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়ায় চলে যান বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঢাকায় দুই জুয়ার চ্যানেল শনাক্ত

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ঢাকায় অভিযান চালিয়ে শামীমের দুটি অনলাইন জুয়ার চ্যানেল শনাক্ত করে সিআইডি। চ্যানেল দুটি রোজ ফ্যাশনের মাসুদের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করতেন শামীম।

ঢাকায় থেকে চ্যানেল দুটি পরিচালনা করতেন সুমন ও শামীমের চাচাতো ভাই সাদ্দাম। সিআইডির অভিযানে সুমন গ্রেপ্তার হলেও সাদ্দাম ও শামীম গ্রেপ্তার এড়িয়ে যান।

ওই দুটি চ্যানেল উদ্ধারের ঘটনায় সিআইডির দায়ের করা মামলায় সাদ্দামকে এক নম্বর, শামীমকে দুই নম্বর এবং সুমনকে তিন নম্বর আসামি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

গ্রেপ্তারের পর নতুন করে আলোচনায় সম্পদের উৎস

অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে শামীমের বিরুদ্ধে মেহেরপুরে দুটি এবং ঢাকার সিআইডিতে আরও তিনটি মামলা চলমান রয়েছে। পাশাপাশি সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার তার বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ তদন্ত করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, অবৈধভাবে অনলাইন জুয়ার এজেন্ট হিসেবে উপার্জিত অর্থের মাধ্যমেই দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলকে ‘ম্যানেজ’ করে চলছিলেন শামীম।

বুধবার রাতে নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে শামীম রেজাকে গ্রেপ্তারের পর কোমরপুরসহ পুরো মেহেরপুরে তার কথিত অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক, বিপুল সম্পদ, অর্থের উৎস এবং দেশ-বিদেশে আর্থিক লেনদেন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এখন তদন্তে বেরিয়ে আসার অপেক্ষায়—শামীমের কথিত অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক কতদূর বিস্তৃত, বিপুল সম্পদের প্রকৃত উৎস কী এবং এসব অর্থের সঙ্গে মানিলন্ডারিংয়ের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।