তিন আসামিকে আদালতে তোলা হয়। ছবি: সংগৃহীত
কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার তিন আসামি আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। রোববার রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবিদা সুলতানা মলির আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
জবানবন্দি দেওয়া তিন আসামি হলো—সাইফুল ইসলাম তুহিন, মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ ও মো. কামরুল হাসান।
রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান সমকালকে বলেন, তিন আসামিই হত্যার দায় স্বীকার করে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবিদা সুলতানা মলির আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। তবে জবানবন্দির বিস্তারিত তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।
একই তথ্য নিশ্চিত করেছেন আদালতের পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান। তিনি বলেন, স্কুলছাত্র অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় রাতে তিন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বিধিমোতাবেক এখন তদন্ত সংস্থা বা পুলিশ পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের ছেলে।
আইফোন ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা, নির্জন জঙ্গলে নিয়ে হত্যা
গত শুক্রবার দুপুরে কোটবাড়ি সালমানপুর এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরদিন শনিবার দুপুরে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
রোববার দুপুর আড়াইটায় এক সংবাদ সম্মেলনে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, একটি আইফোন ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে অপ্রতিমকে পাহাড়ঘেরা নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখানে তাকে হত্যা করা হয়।
পুলিশ সুপার জানান, গত শুক্রবার বিকেল ৩টা ১২ মিনিটে অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম তুহিন লালমাই পাহাড়ের ‘সানন্দা’ নামক স্থানে চারপাশে পাহাড়ঘেরা নির্জন জঙ্গলের ভেতরে যায়। সিসিটিভি ফুটেজে বিষয়টি দেখতে পেয়ে তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন স্বীকার করে, অপ্রতিমের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা করেই তাকে ওই নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন আরও জানায়, ঘটনার সঙ্গে ফাহাদ ও কামরুল নামে তার আরও দুই বন্ধু জড়িত। পরে পুলিশ ফাহাদ ও কামরুলকেও হেফাজতে নেয়।
ধস্তাধস্তির পর বাঁশের লাঠি দিয়ে আঘাত
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও আসামিদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে জানা যায়, ঘটনার দিন বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে অপ্রতিমের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে অপ্রতিম বাধা দিলে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
একপর্যায়ে প্রথমে তুহিন এবং পরে ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করে। এতে তার মৃত্যু নিশ্চিত হলে তুহিন অপ্রতিমের মোবাইল ফোনটি নিয়ে সহযোগীদের সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
পরদিন শনিবার দুপুরে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকা থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সন্দেহভাজন সিয়ামও পুলিশের হেফাজতে
এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে সিয়াম নামে আরও এক তরুণকে আটক করেছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার জানান, গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম তুহিনের বয়স ১৯ বছর। তার বাবার নাম নূর আলম। তিনি নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সানন্দা এলাকার বাসিন্দা। তুহিন কুমিল্লা সিটি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করলেও ফেল করে ঝরে পড়েছেন।
মোফাজ্জেল হোসেন ফাহাদের বয়স ১৫ বছর। সে একই ওয়ার্ডের সালমানপুর এলাকার (মেম্বার বাড়ি) বাসিন্দা এবং ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
মো. কামরুল হাসানের বয়স ১৮ বছর। তার বাড়ি দক্ষিণ উপজেলার হাতিগাড়া গ্রামে। আর মো. সিয়াম (১৯) একই উপজেলার এলাহীপুর গ্রামের বাসিন্দা।
পুলিশ সুপার জানান, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আটককৃতদের বিরুদ্ধে পূর্বে কোনো পিসিআর (পূর্ব অপরাধের রেকর্ড) পাওয়া যায়নি।
ইতোমধ্যে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলকে অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। অপর আসামি সিয়ামের সম্পৃক্ততা যাচাই এবং তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে আদালতে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
