দুবাই-সিঙ্গাপুর-অস্ট্রেলিয়া-সুইজারল্যান্ডে অর্থ পাচার, বিলাসবহুল সম্পদ ও ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগ; নিয়োগ-বদলি-পদায়নেও কোটি কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া (অনুসন্ধানে)। ফাইল ফটো
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে এবার বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ উঠেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে অর্থ পাচার করে বিলাসবহুল সম্পদ কেনা ও বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব অভিযোগের পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে আগের নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে দুর্নীতির অভিযোগও অনুসন্ধান করবে সংস্থাটি।
রোববার কমিশন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে আসা নতুন অভিযোগগুলো অনুসন্ধানের অনুমোদন দিয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অন্যান্য দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রাখা হয়েছে।
দুপুরে এক ব্রিফিংয়ে দুদকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।
নিয়োগ-পদায়নে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ
দুদকে আসা অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং সারা দেশে ৩৬ জন ডিসি পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে টেন্ডার বাণিজ্য এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে টেন্ডার বাণিজ্যের সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন।
উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
দুদকে আসা অভিযোগ অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।
নিয়োগ-বদলি ও পদোন্নতিতেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে।
ঢাকা ওয়াসার এমডি হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দিয়ে ১০ কোটি টাকা উৎকোচ গ্রহণ, এলজিইডির সাবেক চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো. আব্দুর রশীদ খানকে ৫২ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে নিয়োগ এবং ৬৫ কোটি টাকার বিনিময়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সিইও হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, হেলিকপ্টারে ভ্রমণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় করেছেন তিনি। পাশাপাশি হোটেল ওয়েস্টিনসহ পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস ও গাড়িতে চলাচলের অভিযোগও আনা হয়েছে।
বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগ
দুদকে আসা অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশ হলো বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ।
অভিযোগ অনুযায়ী, দুর্নীতির অর্থ দিয়ে পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের গ্রিন গ্রুপে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা করেছেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, তিনি—
দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা
সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি টাকা
অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি টাকা
সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা
পাচার করে সেখানে বিলাসবহুল ভিলা কেনা ও বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন।
এ ছাড়া তাঁর দুই বোনজামাই ও ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচারের অভিযোগও করা হয়েছে।
নিজের উপজেলায় ৪৫৩ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েও অভিযোগ
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরের জন্য ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রকল্পটির বরাদ্দ ও গ্রহণ প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ ছিল বলে অভিযোগকারীর দাবি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তাঁর বাবা বিল্লাল হোসেন ও এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন ঠিকাদারদের একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহ করতেন।
এ ছাড়া তাঁর পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও আনা হয়েছে।
অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক
দুদক জানিয়েছে, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। নতুন করে আসা অভিযোগগুলো নথিভুক্ত করে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। অভিযোগের বিষয়ে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বা তাঁর পক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
