* আইনি ঝামেলা এড়াতে সপরিবারে দেশত্যাগের অভিযোগ
* কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও দুবাইয়ে অর্থ পাচারের দাবি
* সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্তের আশ্বাস দুদকের
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক ও আবগারি বিভাগের সাবেক সদস্য এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক শহিদুল ইসলামকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিপুল সম্পদ, বিদেশে অর্থ পাচার এবং সপরিবারে দেশত্যাগের অভিযোগ। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, একজন সরকারি চাকরিজীবী হয়েও তিনি নামে-বেনামে, স্ত্রী, সন্তান ও নিকট আত্মীয়দের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে গড়ে তুলেছেন শত শত কোটি টাকার সম্পদের বিশাল নেটওয়ার্ক, যার মোট মূল্য হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ক্ষমতার অপব্যবহার, শুল্ক ফাঁকির সুযোগ সৃষ্টি এবং পদ-পদবির প্রভাব খাটিয়ে তিনি এই বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন। অতি সম্প্রতি দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইনি জটিলতা ও সম্ভাব্য তদন্ত এড়াতে তিনি গুরুতর অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বি এবং ছোট ছেলেকে নিয়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান।
পরিবার নিয়ে বিদেশ গমন এনবিআর কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম। ফাইল ছবি
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, এটি কেবল চিকিৎসাসফর নয়; বরং সম্ভাব্য আইনি জটিলতা এড়াতে পরিকল্পিত দেশত্যাগ, এবং তার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। তবে এ বিষয়ে শহিদুল ইসলাম বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংবেদনশীল পদে দায়িত্ব, এরপর সম্পদের বিস্ময়কর বিস্তার
চাকরি জীবনে শহিদুল ইসলাম শুল্ক ও আবগারি বিভাগের সদস্য, কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালের সদস্য এবং ঢাকার পশ্চিম জোনের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারসহ সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
একাধিক কাস্টমস কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, একজন সৎ সরকারি কর্মকর্তার পক্ষে চাকরি জীবনের বেতন, সরকারি স্কলারশিপ, বিদেশ সফর এবং অবসর সুবিধা মিলিয়ে সর্বোচ্চ আড়াই থেকে তিন কোটি টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব। কিন্তু শহিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর নামে অর্জিত সম্পদের পরিমাণ বৈধ আয়ের তুলনায় শতগুণ বেশি বলে অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে সরকারি মহল এবং সচেতন সমাজে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও দুবাইয়ে ‘অদৃশ্য অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য’?
অভিযোগ রয়েছে, কেবল দেশেই নয়, বিপুল অর্থ বিদেশেও পাচার করা হয়েছে। সূত্রগুলোর দাবি, তার দুই জমজ ছেলে কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা শেষ করে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
বিভিন্ন সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা ভাড়া বাসায় থাকার কথা প্রচার করলেও বাস্তবে কানাডায় তাদের নিজেদের নামে দুটি বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে, যেখান থেকে প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্য ভাড়া আয় হয় বলে অভিযোগ। একইভাবে অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছে নিজস্ব আবাসন, আর দুবাইয়ে রয়েছে স্বর্ণ ব্যবসা ও জুয়েলারি খাতে বিনিয়োগের অভিযোগ।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সম্পত্তির মালিকানার সরকারি নথিও জনসমক্ষে আসেনি।
ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে আত্মীয়দের ব্যবসায়িক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, নিজের পদমর্যাদার প্রভাব ব্যবহার করে তিনি আপন ভাই সেলিমকে চট্টগ্রামে দুটি সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স পাইয়ে দেন। এই লাইসেন্সকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে বলেও দাবি করা হচ্ছে। এছাড়া তার ছোট ভাই জাকিরের নামেও বিপুল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের অভিযোগ রয়েছে।
রাজধানীতে শত কোটি টাকার ‘শেল কবিতা’
বিদেশের পাশাপাশি দেশের মাটিতেও দৃশ্যমান সম্পদের বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে এই দম্পতির বিরুদ্ধে।
রাজধানীর অভিজাত আবাসিক এলাকা বসুন্ধরার জি ব্লকে ‘শেল কবিতা’ নামে ১০ তলা একটি বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতি ফ্লোরে আড়াই হাজার বর্গফুটের দুটি করে মোট ২০টি ফ্ল্যাটের পুরো ভবনটি তাদের নিজস্ব মালিকানাধীন বলে দাবি করা হচ্ছে।
ফ্ল্যাট ব্যবসায়ীদের মতে, জমিসহ ভবনটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় একশ কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে—
বাংলামোটরের স্বজন টাওয়ারে দুটি ফ্ল্যাট;
শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় বাণিজ্যিক দোকান;
নিউমার্কেটে দুটি দোকান;
স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বির নামে শেয়ারবাজারে প্রায় ৮০ কোটি টাকার বিনিয়োগ;
একটি ব্যাংক হিসাবে কয়েক কোটি টাকার আমানত;
বসুন্ধরার জেসিএক্স বিজনেস টাওয়ারে ছেলের জন্য বিলাসবহুল অফিস;
ভেলোসিটি গ্রুপের অধীনে ব্যবসায় নগদ কোটি টাকার মূলধন বিনিয়োগের অভিযোগ।
দুদকের অবস্থান
বিষয়টি নিয়ে দুদকের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি অনুসন্ধান করে দেখা হবে।
উত্তরহীন প্রশ্ন
সার্বিক বিষয়ে মন্তব্য জানতে শহিদুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ফলে এখন জনমনে প্রশ্ন উঠছে—
বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের এই বিপুল ব্যবধানের উৎস কী?
বিদেশে সম্পদ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ কতটা সত্য?
দেশত্যাগ কি কেবল চিকিৎসার জন্য, নাকি সম্ভাব্য আইনি জটিলতা এড়ানোর কৌশল?
অভিযোগগুলো কি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে?
সব মিলিয়ে শহিদুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা এই অভিযোগ এখন শুধু একজন সাবেক এনবিআর কর্মকর্তার সম্পদ বিতর্ক নয়; বরং এটি সরকারি ক্ষমতার ব্যবহার, সম্পদের উৎস, জবাবদিহিতা এবং অর্থ পাচারবিরোধী ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অভিযোগগুলো সত্য নাকি ভিত্তিহীন—তার উত্তর মিলতে পারে কেবল স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে।
