বৃহস্পতিবার, ২৯শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

এলজিইডির পিডি বাবুল আখতারের বিরুদ্ধে টেন্ডার কারসাজিতে শতকোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ২৯, ২০২৬ ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

করোনাকালে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ • প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কার্যাদেশ • ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ। ফাইল ছবি

পিরোজপুরের পর এবার মাদারীপুর জেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ঘিরে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মাদারীপুরের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী এবং বর্তমানে এলজিইডির একটি বড় সরকারি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) বাবুল আখতারের বিরুদ্ধে টেন্ডার কারসাজি, অতিমূল্যে কার্যাদেশ প্রদান এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি, ডিএফপি অনুমোদনহীন অখ্যাত পত্রিকায় গোপনে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, কাগজপত্রে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল উত্তোলন, অতিমূল্যে কার্যাদেশ প্রদান এবং প্রকল্প সংশোধনের (রিভিশন) মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যয়ের নামে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে একটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের সম্পৃক্ততার কথাও উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশেষ করে করোনাকালীন সময়ে মাদারীপুর এলজিইডির প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে শতকোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরেও আনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পগুলোর বিভিন্ন দরপত্রে প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় কোটি কোটি টাকা বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সরকারি উন্নয়নকাজে দরপত্রের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ব্যয় কমানোর কথা থাকলেও একাধিক ক্ষেত্রে উল্টো বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

প্রাক্কলনের চেয়ে ৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা বেশি দামে কার্যাদেশ

অভিযোগের অন্যতম বড় উদাহরণ শিবচর উপজেলার একটি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প। দরপত্র আইডি ৫৮৯৬৪৫-এর আওতায় আড়িয়াল খাঁ ব্রিজ থেকে বাবলাতলা বাজার এবং শিবচর সদর থেকে রাজৈর ভায়া উত্রাইল জিসি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে ২৩ কোটি ১৮ লাখ টাকার প্রাক্কলনের বিপরীতে ২৬ কোটি ৬০ লাখ টাকায় কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

কাজটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হামীম ইন্টারন্যাশনাল। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় প্রায় ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ায় অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সরকারি নির্মাণকাজে সাধারণত দরপত্রের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কম দরে কার্যাদেশ দেওয়ার প্রবণতা থাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একই দরপত্রের আরেকটি প্যাকেজেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সেখানে ২২ কোটি ৫৪ লাখ টাকার প্রাক্কলনের বিপরীতে প্রায় ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, এতে সরকারের প্রায় ২ কোটি ২২ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।

সেতু নির্মাণেও অতিমূল্যে কার্যাদেশের অভিযোগ

শিবচর উপজেলায় অনূর্ধ্ব ১০০ মিটার সেতু নির্মাণ প্রকল্পেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। দরপত্র আইডি ৫৬০৫০৫-এর আওতায় প্রায় ১৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকার একটি কাজে একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, এ প্রকল্পে প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।

এ ছাড়া আরসিআইপি প্রকল্পের আওতায় মাদারীপুর সদর উপজেলায় প্রায় ২৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্পে ‘ভুয়া প্রাক্কলন’ তৈরি করে অনুমোদন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ওই কাজটি মেসার্স কহিনুর এন্টারপ্রাইজকে দেওয়া হয় বলে অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

ছোট-বড় একাধিক প্রকল্পে একই ধরনের অভিযোগ

অনুসন্ধানে মাদারীপুর এলজিইডির আরও কয়েকটি ছোট ও মাঝারি প্রকল্পে প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। দরপত্রের আইডি, প্যাকেজ ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী—

দরপত্র আইডি ২৬২৯৭৫ (প্যাকেজ ২২৮): ৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেশি দামে মেসার্স পাভেল এন্টারপ্রাইজকে কার্যাদেশ।

দরপত্র আইডি ৩৩৮৩২৯ (প্যাকেজ ৩০৮): ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ বেশি দামে হাবিবা কনস্ট্রাকশনকে কার্যাদেশ।

দরপত্র আইডি ৩১৬০৬৯ (প্যাকেজ ২৭৮): ৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ বেশি দামে মেসার্স মোহাম্মদ ফারুক মিয়াকে কার্যাদেশ।

দরপত্র আইডি ২৬২৯৭৬ (প্যাকেজ ২১৪): ৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ বেশি দামে মেসার্স হামীম ইন্টারন্যাশনালকে কার্যাদেশ।

দরপত্র আইডি ৩৩৮৩৩০ (প্যাকেজ ৩০৯): ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি দামে মেসার্স আতাহার এন্টারপ্রাইজকে কার্যাদেশ।

দরপত্র আইডি ৩৩৩২০০ (প্যাকেজ ২৮০): ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ বেশি দামে মেসার্স মাদবর ট্রেডার্সকে কার্যাদেশ।

এ ছাড়া কয়েকটি এইচবিবি ও ড্রেনেজ প্রকল্পেও প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রকল্পে লাখ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

করোনাকালীন প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন

অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, করোনাকালীন লকডাউনের সময় মাদারীপুর এলজিইডিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। বিশেষ করে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের প্রকল্পগুলোর দরপত্র, প্রাক্কলন, কার্যাদেশ, বিল ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করা হলে এসব অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ রয়েছে, ওই সময়ে প্রশাসনিক নজরদারি দুর্বল থাকার সুযোগে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো, প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় বেশি দামে কার্যাদেশ প্রদান এবং ঠিকাদারি সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

ঠিকাদারি সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ

এলজিইডির বিশেষ সূত্রে জানা যায়, নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বাবুল আখতার তাঁর ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারি সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

একাধিক প্রকল্পে একই ধরনের উচ্চ দর অনুমোদনের ঘটনায় পরিকল্পিত যোগসাজশের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে দরপত্র মূল্যায়ন, কার্যাদেশ প্রদান, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বিল পরিশোধের নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, করোনাকালীন সময়ে প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতি থাকায় সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সরকারি অর্থের অপচয় বা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করা জরুরি।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মাদারীপুর এলজিইডির সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর টেন্ডার প্রক্রিয়া, প্রাক্কলন অনুমোদন, কার্যাদেশ প্রদান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের আর্থিক নথিপত্র স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

তাঁদের মতে, প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয়, দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের দর, অনুমোদিত কার্যাদেশ, বাস্তব কাজের পরিমাণ এবং পরিশোধিত বিলের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হলে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযুক্ত বাবুল আখতারের কাছে মোবাইল ফোনে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি ফোনকলটি রিসিভ করেননি।

তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এসব অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। আরো বিস্তারিত থাকবে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে…

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।