২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার বিরুদ্ধে কমিশনের বিনিময়ে এপিপি (APP) বরাদ্দের একাধিক উন্নয়নকাজ সম্পন্ন না করিয়েই ঠিকাদারদের পূর্ণ বিল পরিশোধ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ২ কোটি ৬৪ লাখ টাকার বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ অসম্পূর্ণ বা শুরুই না হওয়া সত্ত্বেও সরকারি নথিতে সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারদের বিল ছাড় করা হয়েছে।
অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে পরিদর্শনে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রকল্পে কাজের বাস্তব চিত্র ও সরকারি নথির মধ্যে অসঙ্গতির তথ্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইস্কাটন গার্ডেনে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার কাজ, বাস্তবে অসম্পূর্ণ
দরপত্র আইডি নং-১২৩৬২৩৯ অনুযায়ী ইস্কাটন গার্ডেন সরকারি অফিসার্স কোয়ার্টার্সের অরুণিমা-নিহারিকা ক্যাম্পাসের উত্তর ও দক্ষিণ পাশের ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ সীমানা প্রাচীর পুনর্নির্মাণ ও উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়।
দরপত্র অনুযায়ী কাজটি ২৩ জুন ২০২৬-এর মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অর্থবছর শেষ হওয়ার পর সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কাজটি এখনো অসম্পূর্ণ। অভিযোগ রয়েছে, এর পরও সরকারি নথিতে কাজ শতভাগ সম্পন্ন দেখিয়ে জুন ক্লোজিংয়ের আগেই ঠিকাদারকে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
৪০ লাখ টাকার আরেক প্রকল্পেও একই অভিযোগ
দরপত্র নং-১২৩৬১৩০ অনুযায়ী ইস্কাটন গার্ডেন সরকারি কর্মকর্তা কোয়ার্টারের সোনালী-রূপালী ক্যাম্পাসের সামনের জরাজীর্ণ সীমানা প্রাচীর পুনর্নির্মাণের জন্য প্রায় ৪০ লাখ টাকার কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়।
এই কাজও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয়নি বলে অভিযোগ। অথচ সরকারি কাগজপত্রে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারকে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, এখানেও কমিশন লেনদেনের মাধ্যমে বিল ছাড় করা হয়েছে।
মুগদা হাসপাতালে কাজ না করেই বিল পরিশোধের অভিযোগ-
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একাধিক প্রকল্প নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে।
দরপত্র নং-১২৭৫৪০২ অনুযায়ী হাসপাতালের ৮ম ও ৯ম তলার ক্ষতিগ্রস্ত এসএস (SS) কলাম গার্ড ও ভাঙা টাইলস পরিবর্তনের জন্য প্রায় ১০ লাখ টাকার কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভাঙা টাইলস এখনো আগের অবস্থাতেই রয়েছে এবং এসএস কলাম গার্ডে মরিচা স্পষ্ট। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৪ জুন ২০২৬-এর মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকা এই কাজ বাস্তবে সম্পন্ন না হলেও পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধ প্রকল্পেও প্রশ্ন
দরপত্র নং-১২৭৫৪৭৮ অনুযায়ী হাসপাতালের ড্রেন সংস্কার, সেপটিক ট্যাংক, সোক-ওয়েল, ইন্সপেকশন পিট ও সয়েল পাইপ পরিষ্কার এবং ভবনের আশপাশের আবর্জনা ও আগাছা অপসারণের জন্য প্রায় ১৪ লাখ টাকার কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, জুন ক্লোজিংয়ে এই কাজেরও পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়েছে। তবে সরেজমিনে হাসপাতাল এলাকায় এখনো ময়লা-আবর্জনার স্তূপ ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ চোখে পড়েছে।
সড়ক ও পার্কিং সংস্কারেও মিলেছে অসঙ্গতি
দরপত্র আইডি নং-১২৭৫৬৩৮ অনুযায়ী মুগদা ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের সামনের ক্ষতিগ্রস্ত ও জলমগ্ন বিটুমিনাস কার্পেটিং সড়ক এবং পার্কিং এলাকা সংস্কারের জন্য প্রায় ২৪ লাখ টাকার কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি নথিতে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করা হলেও সরেজমিনে পার্কিং এলাকার বিভিন্ন স্থানে এখনো বিটুমিনাস কার্পেটিংয়ের কাজ অসম্পূর্ণ দেখা গেছে।
পিপিআর লঙ্ঘনের অভিযোগ
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বিশেষ সুবিধা দিতে আগাম বিল ছাড় করা হয়েছে এবং এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের কমিশন গ্রহণ করা হয়েছে।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অনুযায়ী, কাজ সম্পন্ন না করেই বিল পরিশোধ করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা, আর্থিক জরিমানা, সরকারি ক্ষতির অর্থ আদায়, এমনকি সাময়িক বরখাস্ত বা চাকরিচ্যুতির মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে।
যোগাযোগের চেষ্টা করেও, মেলেনি বক্তব্য
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পাশাপাশি তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বার্তা পাঠানো হলেও সংবাদ প্রকাশ পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, উল্লিখিত অভিযোগগুলো অভিযোগপত্র ও সরেজমিনে পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা নিশ্চিত হবে। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঠিক তদন্তের দিকে তাকিয়ে আছে সংশ্লিষ্টরা।
