সচিবের দপ্তর ঘিরে অর্থ লেনদেন, ফাইল তদবির ও দাপ্তরিক তথ্য পাচারের অভিযোগ; সম্পদ ও বরাদ্দের নথি তদন্তের দাবি। ফাইল ছবি
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের দপ্তরে অর্থের বিনিময়ে দাপ্তরিক তথ্য পাচার, দায়িত্বের অপব্যবহার এবং সংঘবদ্ধ একটি চক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) গাজী মোকছেদের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ এই দপ্তরে দায়িত্ব পালনকে কেন্দ্র করে তিনি প্রভাবশালী একটি বলয় তৈরি করেছেন। এতে মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি দাপ্তরিক তথ্যের গোপনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক সরকারের আমলে বিভিন্ন সচিবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে গাজী মোকছেদ নিয়মবহির্ভূতভাবে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ঢাকার লালমাটিয়া এলাকার একটি ফ্ল্যাট এবং রাজউকের ঝিলমিল প্রকল্পে একটি প্লট বাগিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, লালমাটিয়া ৫৪ ফ্ল্যাট প্রকল্প, স্বপ্নপুরী আবাসনের বি-৯ নম্বর ফ্ল্যাট এবং ঝিলমিল প্রকল্পের সেক্টর-০৪, রোড-১৪, প্লট নং-১০ তার নামে বরাদ্দের বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী একই ব্যক্তি সরকারি ফ্ল্যাট বরাদ্দ পাওয়ার পর সরকারি প্লট বরাদ্দ নেওয়ার সুযোগ থাকার কথা নয়। কিন্তু ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে গাজী মোকছেদ একই সঙ্গে ফ্ল্যাট ও প্লট পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বের করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এছাড়া মিরপুরের রূপনগর ও ইস্কাটন এলাকায় তার একাধিক ফ্ল্যাটসহ বিপুল সম্পদের কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সম্পদের উৎস ও অর্জনের বৈধতা যাচাই করতে সম্পদের হিসাব পরীক্ষা পরীক্ষা করার দাবিও উঠেছে।
১৭ বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব, তথ্য পাচারের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, গাজী মোকছেদ দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে সাবেক সরকারের আমলের বিভিন্ন সচিবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ কারণে সাবেক কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে এবং সেই যোগাযোগের সূত্র ধরে বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক তথ্য বাইরে পাচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, গুরুত্বপূর্ণ নথি, ফাইলের অগ্রগতি ও দাপ্তরিক সিদ্ধান্তের তথ্য বাইরে চলে গেলে সরকার ও মন্ত্রণালয় উভয়ই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে পারে। ফলে সচিবের দপ্তর থেকে তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
কম্পিউটার দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন, পদোন্নতি তদন্তের দাবি
গাজী মোকছেদের কম্পিউটার পরিচালনার দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, কম্পিউটার ব্যবহারে তিনি দক্ষ না হওয়া সত্ত্বেও প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পেয়েছেন।
এ ক্ষেত্রে তার পদোন্নতি, যোগ্যতা, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগ ‘সমাধানের’ নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ
অভিযোগের আরও গুরুতর অংশ সচিবের দপ্তরে বিভিন্ন অভিযোগ, ফাইল ও দাপ্তরিক চিঠিকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের বিষয়টি।
অভিযোগকারীদের দাবি, মন্ত্রণালয় বা অধীন কোনো দপ্তর-সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে সচিবের দপ্তরে অভিযোগ জমা পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ফোন করে বিষয়টি জানানো হয়। পরে অভিযোগটি ‘সমাধান’ করে দেওয়ার কথা বলে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তি ফাইলের বিষয়ে তদবির করতে এলে তাকেও বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। সচিবের দপ্তরে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফাইল এলে ফাইল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ফোন করে তদবিরের নামে অর্থ দাবি করা হয় বলেও অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
দাপ্তরিক কোনো চিঠি আসার পর চিঠির ধরন ও গুরুত্ব বুঝে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানিয়ে অর্থ দাবি করার অভিযোগও রয়েছে।
‘সংঘবদ্ধ চক্রের’ মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া—অভিযোগ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব কর্মকাণ্ড এককভাবে নয়, বরং সচিবের দপ্তরের একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অফিসের কাজ শেষে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয় বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।
তাদের আরও অভিযোগ, সচিবের দপ্তরের কয়েকজন স্টাফ দীর্ঘদিন ধরে একই জায়গায় কর্মরত থাকায় একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি হয়েছে। এই বলয়ের মাধ্যমে দাপ্তরিক তথ্য বাইরে সরবরাহ, ফাইলের তদবির এবং বিভিন্ন অনিয়ম পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ নিয়ে কথা বলতে অনীহা?
উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে গাজী মোকছেদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি নানা অজুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে যান বলে অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য এবং কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ।
সচিবালয়ে আলোচনা, তদন্তের দাবি
এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সচিবালয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগী ও অভিযোগকারীরা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের কাছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তাদের দাবি, মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সচিবের দপ্তরে দীর্ঘদিন একই ব্যক্তিদের কর্মরত থাকা, দাপ্তরিক তথ্যের গোপনীয়তা, ফাইল ব্যবস্থাপনা এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীরা প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব, প্লট-ফ্ল্যাট বরাদ্দের নথি, ব্যাংক লেনদেন, পদোন্নতি ও নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং দাপ্তরিক যোগাযোগের রেকর্ড পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসার পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের দাপ্তরিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
