৪৮টি ভাটার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ, তারপরও মৌসুম শুরুর আগেই উৎপাদনের প্রস্তুতি; কোথাও কাঠ মজুত, কোথাও চুল্লিতে আগুন দেওয়ার অপেক্ষা। ছবি: সংগৃহীত
চাঁদপুরে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা, একাধিকবার নোটিশ এবং অভিযানেও বন্ধ করা যাচ্ছে না অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম। মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই জেলার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ ইটভাটাগুলোতে চলছে উৎপাদনের প্রস্তুতি। কোথাও ইট তৈরির কাজ শুরু হয়েছে, কোথাও আবার ইট পোড়ানোর জন্য মজুত করা হয়েছে জ্বালানি কাঠ। এখন শুধু চুল্লিতে আগুন দেওয়ার অপেক্ষা। আবার কিছু ইটভাটা হাইকোর্টের আদেশের দোহাই দিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার আট উপজেলায় নিবন্ধন নবায়ন না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে ৪৮টি ইটভাটাকে অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অথচ প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা ও নোটিশ উপেক্ষা করে এসব ভাটার অনেকগুলোতেই নতুন মৌসুমে উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি চলছে। এতে পরিবেশদূষণ, বায়ুর মানের অবনতি, কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাস এবং জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে চাঁদপুর সদর, ফরিদগঞ্জ, হাজীগঞ্জ ও মতলব উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত অবৈধ ইটভাটায় মৌসুম শুরুর প্রস্তুতির চিত্র দেখা গেছে। কোথাও ইট তৈরির কার্যক্রম চলছে, আবার কোথাও ভাটা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জ্বালানি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভাটা পরিচালনা না করার নির্দেশনা দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট মালিকদের একটি অংশ তা উপেক্ষা করে কার্যক্রম চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চাঁদপুর জেলার আট উপজেলায় মোট ইটভাটার সংখ্যা ৯৪টি। এর মধ্যে নিবন্ধন নবায়ন না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে ৪৮টি অবৈধ এবং ৪৬টি বৈধ হিসেবে চিহ্নিত।
উপজেলাভিত্তিক অবৈধ ইটভাটার সংখ্যা হলো—ফরিদগঞ্জে ১৪টি, শাহরাস্তিতে ৮টি, মতলব উত্তরে ৭টি, হাজীগঞ্জে ৬টি, চাঁদপুর সদরে ৫টি, মতলব দক্ষিণে ৪টি, কচুয়ায় ৩টি এবং হাইমচরে ১টি।
এর মধ্যে ফরিদগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ ইটভাটার আশপাশেই রয়েছে বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলি জমি। অভিযোগ রয়েছে, এসব ভাটায় ইট তৈরির জন্য কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে জমির উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে ভাটাগুলো চালু হলে নির্গত ধোঁয়া ও দূষিত বায়ু আশপাশের পরিবেশ এবং মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সরেজমিনে কয়েকটি ভাটায় নতুন মৌসুমে চুল্লিতে আগুন জ্বালানোর প্রস্তুতি হিসেবে গাছের গুঁড়ি ও জ্বালানি কাঠ মজুত করতেও দেখা গেছে। ফলে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযান হয়, জরিমানা হয়, তবুও বন্ধ থাকে না ভাটা
এদিকে ২০২৫ সালে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর যৌথভাবে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে। ওই সময় কয়েকটি ভাটায় জরিমানা আদায় এবং স্থাপনা ভেঙে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিন পরই অনেক ভাটায় আবার উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অভিযান ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের পরও অবৈধ ইটভাটাগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, একাধিকবার অভিযান পরিচালনা ও নোটিশ দেওয়ার পরও কীভাবে একই ভাটাগুলো আবার কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নিতে পারে? যেসব ভাটার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত তদারক করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
চারটি ভাটা বন্ধে যৌথ অভিযানের উদ্যোগ
পরিবেশ অধিদপ্তর চাঁদপুর জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান জানান, জেলায় ৪৮টি অবৈধ এবং ৪৬টি বৈধ ইটভাটা রয়েছে। অবৈধ ভাটার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মালিকদের নিয়ে একাধিকবার সভা করা হয়েছে। সভায় অবৈধভাবে ভাটা পরিচালনা না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মালিকদের নোটিশও দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, জেলার চারটি অবৈধ ইটভাটা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে যৌথ অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য অবৈধ ভাটার বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
হাইকোর্টের আদেশে চলছে কিছু ভাটা, দাবি মালিক সমিতির
এ বিষয়ে জেলা ইট ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সফিকুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, আসলে অবৈধের মধ্যে অধিকাংশই বন্ধ আছে। চিমনি দাঁড়ানো আছে এরকম ফিল্ড অবৈধ ব্রিক ফিল্ডের তালিকায় রয়েছে। আসলে সেগুলো বন্ধই আছে। আবার অনেকে হাইকোর্টের আদেশ নিয়ে চালাচ্ছেন। সেগুলোও অবৈধ তালিকায় আছে। এরা আদালতে রিট করে চালাচ্ছেন।’
তবে আদালতের আদেশে যেসব ইটভাটা পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে আদেশের পরিধি ও শর্ত কী, তা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইন অমান্য করলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রশাসনের
চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, জেলার ৪৮টি অবৈধ ইটভাটার মালিককে কার্যক্রম পরিচালনা না করার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এরপরও কেউ অবৈধভাবে ভাটা পরিচালনা করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগেও কয়েকটি ইটভাটা ভেঙে দিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
অভিযানের পরও কীভাবে আবার অবৈধ ইটভাটাগুলো চালু হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট মালিকদের বিরুদ্ধে স্থায়ীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, ইটভাটা পরিচালনার বিষয়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা পরিস্থিতি বিবেচনায় আইন প্রয়োগ করেন। আইনে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ, কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এবার নজর পিরোজপুরের জিয়ানগরে: নদীভাঙন এলাকায় অবৈধ ইটভাটার বিশেষ অনুসন্ধান
চাঁদপুরের অবৈধ ইটভাটার চিত্রের পর এবার অনুসন্ধানের নজর পিরোজপুর জেলার জিয়ানগর উপজেলার ৪ নম্বর চণ্ডীপুর ইউনিয়নের খোলপটুয়া ছোট্ট মৌজায়। নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় অবৈধ ইটভাটা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির মধ্যেই বছরের পর বছর ধরে এসব ইটভাটার কার্যক্রম চলে আসছে।
নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় ইটভাটা স্থাপন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিবেশগত ঝুঁকি, কৃষিজমি ও নদী তীরের ক্ষয়ক্ষতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কীভাবে বছরের পর বছর এসব ভাটা পরিচালিত হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ভূমিকা কী, নোটিশ বা নিষেধাজ্ঞা থাকলে তা কতটা কার্যকর করা হয়েছে এবং আইন প্রয়োগে কোনো ধরনের শৈথিল্য রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই থাকছে ধারাবাহিক বিশেষ প্রতিবেদন।
পিরোজপুরের জিয়ানগরের খোলপটুয়া ছোট্ট মৌজার অবৈধ ইটভাটা নিয়ে সরেজমিন অনুসন্ধান, স্থানীয়দের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এবং প্রশাসনিক নথিপত্রের বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে।
