ফাইল ছবি
সরকারি দপ্তরে এসে একজন সুনাগরিক হিসেবে নির্ধারিত নিয়মে সেবা পাওয়ার অধিকার যেন এখন অনেকটাই দুষ্প্রাপ্য। বগুড়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন শত শত সাধারণ মানুষকে নানা ধরনের ভোগান্তি, হয়রানি ও অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি নিয়ম মেনে সরাসরি আবেদন করতে গেলেই একের পর এক ত্রুটি দেখিয়ে আবেদনকারীদের ঘুরিয়ে রাখা হয়। অথচ দালালদের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করলেই অদৃশ্য হয়ে যায় সব জটিলতা, দ্রুত সম্পন্ন হয়ে যায় কাঙ্ক্ষিত কাজ।
এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বগুড়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক (ডিডি) মানিক চন্দ্র দেবনাথ এবং সহকারী পরিচালক (এডি) আজিজ। ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, তাদের নীরব প্রশ্রয়েই অফিসজুড়ে দালাল সিন্ডিকেট বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে প্রতিবেদক গ্রাহক সেজে একাধিক দালালের সঙ্গে কথা বলে। সেখান থেকে উঠে আসে বিস্ময়কর সব তথ্য। দালাল চক্রের সদস্যরা দাবি করেন, ডিডি মানিক চন্দ্র দেবনাথ যোগদানের পর থেকেই তাদের কার্যক্রম আরও সহজ ও বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে পাসপোর্ট সংক্রান্ত প্রায় সব ধরনের জটিলতা—সাধারণ কিংবা জটিল আবেদন, সংশোধন, আটকে থাকা ফাইল কিংবা অন্যান্য সমস্যারও তারা “১০০ শতাংশ গ্যারান্টি” দিয়ে সমাধানের আশ্বাস দেন।
অভিযোগ রয়েছে, এই সুবিধার পেছনে চলছে নিয়মবহির্ভূত আর্থিক লেনদেন। সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে একটি সাধারণ পাসপোর্টের জন্য ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয় বলে অভিযোগ। সেই অর্থের মধ্য থেকে প্রতি ফাইলে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা “অফিস খরচ” নামে প্রতিদিন বিকেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন দালালরা। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অলিখিত সমঝোতার কারণেই দালালদের মাধ্যমে জমা দেওয়া ফাইল দ্রুত অনুমোদন পায় এবং বিভিন্ন যাচাই-বাছাইও অনেক ক্ষেত্রে শিথিল হয়ে যায়।
ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, অনলাইনে আবেদন জমা দেওয়া, তথ্য সংশোধন, ছবি তোলা কিংবা অন্যান্য সাধারণ প্রক্রিয়াগুলোকেও ইচ্ছাকৃতভাবে জটিল করে তোলা হয়। সরাসরি আবেদনকারীদের ফাইলে সামান্য ত্রুটি দেখিয়ে বারবার ফিরিয়ে দেওয়া যেন একটি নিয়মিত কৌশলে পরিণত হয়েছে। এতে সময়, অর্থ ও মানসিক ভোগান্তিতে পড়ে শেষ পর্যন্ত অনেকেই বাধ্য হয়ে দালালদের দ্বারস্থ হচ্ছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে সরকারি সেবা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নাগরিক আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে চলা এই দালাল চক্র এবং তাদের মদদদাতা হিসেবে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সরকারের ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
এদিকে, উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপ-পরিচালক (ডিডি) মানিক চন্দ্র দেবনাথের সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
আবার বগুড়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের কথিত দালাল সিন্ডিকেট, অভিযোগের নেপথ্যের প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং আর্থিক লেনদেনের বিস্তারিত অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। এই অনুসন্ধানের পরবর্তী পর্বে প্রকাশ করা হবে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।
