বাড়ছে পদ্মার পানি, তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট-ফসলের মাঠ; ৩৫০ হেক্টর জমির ক্ষতি। ফাইল ছবি
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পানি আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকায় নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ৫০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট, ফসলি জমি ও বিভিন্ন স্থাপনার আশপাশের এলাকা। দেখা দিয়েছে গবাদিপশুর নিরাপত্তা, গো-খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট।
বন্যার পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ১৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে স্থানীয়ভাবে পাঠদান কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, উজান থেকে ফারাক্কা হয়ে নেমে আসা ঢলে গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে পদ্মা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৪ সেন্টিমিটার করে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক সপ্তাহে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি প্রায় ৮৮ সেন্টিমিটার বেড়েছে।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টা পর্যন্ত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ দশমিক ০২ মিটার। ওই পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। অর্থাৎ শুক্রবার সকাল ৯টার হিসাব অনুযায়ী বিপৎসীমার মাত্র ৭৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মার পানি। পানি বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, উপজেলার ভাগজত পয়েন্টেও পদ্মার পানি দ্রুত বাড়ছে। শুক্রবার সকাল ৯টায় এ পয়েন্টে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৪ দশমিক ৯০ মিটার। সেখানে বিপৎসীমা ১৫ দশমিক ৫২ মিটার।
পাউবো সূত্র বলছে, ভাগজত পয়েন্টে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ১৭ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছে। ফলে এ পয়েন্টেও বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে নদীর পানি। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় দৌলতপুরের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, পদ্মার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৌলতপুর উপজেলার চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। এতে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন দুই ইউনিয়নের ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। বন্যার পানি ফিলিপনগর, মরিচা, চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর এলাকার ফসলি জমিতেও ঢুকে পড়েছে।
পানির নিচে চলে গেছে রোপা আমন ধান, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল। উপজেলা কৃষি বিভাগের হিসাবে, নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে বসতবাড়ির কাছাকাছি পানি পৌঁছে যাওয়ায় দুর্গত এলাকার মানুষের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। গবাদিপশু নিরাপদে রাখা, গো-খাদ্য সংগ্রহ এবং বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। স্থানীয়দের আশঙ্কা, পানি আরও বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, ‘‘উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হঠাৎ পদ্মার পানি বেড়ে যাওয়ায় ইউনিয়নের সবকটি গ্রাম ও ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। অধিকাংশ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে এবং উপজেলা প্রশাসনকে নিয়মিত অবহিত করা হচ্ছে।
এদিকে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহম্মেদ বলেন, ‘‘পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ কারণে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেওয়া না হলেও বন্যাকবলিত এলাকার ১৮টি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আপাতত ক্লাসে আসতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে শ্রেণি পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে বিদ্যালয় ভবনগুলো খোলা থাকবে, যাতে বন্যায় গৃহহীন মানুষ সেখানে নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারেন।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন বলেন, নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠে কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও কৃষি পরামর্শ দেওয়া হবে।
আবার দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতির নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। পানিবন্দি মানুষের সহযোগিতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে চিলমারী ইউনিয়নের অসহায় ও দুস্থ পরিবারের মধ্যে সীমিত পরিসরে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
