একই পরিবারের চারজনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার চারজন। ছবি: সংগৃহীত
নওগাঁর নিস্তব্ধ রাত হঠাৎই ভেঙে যায় এক বিভীষিকাময় আর্তনাদে। আত্মীয়তার বন্ধন যেখানে ভালোবাসার আশ্রয় হওয়ার কথা, সেখানে লোভ আর প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ে গেল একটি পুরো পরিবার। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে নিয়ামতপুরে একই পরিবারের চারজনকে গলা কেটে হত্যা করেছে আপনজনরাই—ভাগনে, দুলাভাইসহ ছয়জনের রক্তশীতল করা পরিকল্পনায়।
বুধবার দুপুর আড়াইটায় পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম এই ভয়াবহ ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে রয়েছেন নিহত হাবিবুর রহমানের দুলাভাই শহিদুল ইসলাম, তাঁর ছেলে শাহিন হোসেন এবং আরেক বোনের ছেলে সবুজ রানা—যাদের সঙ্গে ছিল রক্তের সম্পর্ক, অথচ সেই সম্পর্কই হয়ে উঠেছে মৃত্যুর ফাঁদ।
ঘটনার শিকড় বহুদিনের জমি বিরোধে। হাবিবুরের বাবা নমির উদ্দিন তাঁর ১৭ বিঘা সম্পত্তির মধ্যে বসতবাড়িসহ ১৩ বিঘা জমি ছেলেকে লিখে দেন। বাকি অংশ দেন মেয়েদের। এই ‘অসম বণ্টন’ই ধীরে ধীরে বিষিয়ে তোলে পারিবারিক সম্পর্ক—জমে ওঠে ক্ষোভ, জন্ম নেয় ঘৃণা, আর শেষ পর্যন্ত তৈরি হয় ভয়ঙ্কর হত্যার নীলনকশা।
গত সোমবার বিকেলে ভাগনে সবুজ রানাকে সঙ্গে নিয়ে হাবিবুর গরু কিনতে যান ছাতড়া বাজারে। কিন্তু সেটিই ছিল মৃত্যুর আগে শেষ স্বাভাবিক মুহূর্ত। রাতে বাড়ি ফেরার পর, অন্ধকারের আড়ালে শুরু হয় রক্তাক্ত ষড়যন্ত্রের বাস্তবায়ন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাত ৮টার দিকে সবাই মিলে বাড়িতে প্রবেশ করে। খাবার টেবিলে তখন ছিল স্বাভাবিকতার ছদ্মবেশ। অথচ সেই সময়ই শাহিন গোপনে একটি ঘরে লুকিয়ে পড়ে। রাত গভীর হলে, ঘুমে আচ্ছন্ন পরিবারকে ঘিরে ফেলে মৃত্যু।
প্রথমে হাবিবুরের বাবার ঘর বাইরে থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর হাবিবুরের ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁর গলা কেটে হত্যা করা হয়। সেই দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে ওঠে তাঁর স্ত্রী পপি সুলতানা—যিনি বাথরুমে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে এসে নিজেই শিকার হন নিষ্ঠুর আঘাতের। তাঁকেও রেহাই দেওয়া হয়নি।
এরপর যেন পৈশাচিক উন্মাদনায় মেতে ওঠে ঘাতকরা—পরিবারকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে শিশু সন্তান পারভেজ রহমান ও সাদিয়াকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
পরদিন সকালে ঘটনা জানাজানি হলে, সন্দেহের তীর ঘুরে যায় আপনজনদের দিকেই। পুলিশ দ্রুত তদন্তে নেমে জিজ্ঞাসাবাদে নেয় কয়েকজনকে। এক পর্যায়ে ভাগনে সবুজ রানা ভেঙে পড়ে—স্বীকার করে নেয় পুরো হত্যাকাণ্ড। তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে উদ্ধার করা হয় হত্যায় ব্যবহৃত হাঁসুয়া ও ছুরি—একটি খড়ের পালা থেকে, আরেকটি পুকুরের তলদেশ থেকে।
পুলিশ জানায়, পরিকল্পনাটি ছিল ভয়াবহ—পুরো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করলে হাবিবুরের সম্পত্তির ভাগিদার হয়ে যাবে তারা। এই নিষ্ঠুর লোভই রক্তের সম্পর্ককে রূপ দেয় মৃত্যুর চুক্তিতে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম ও জয়ব্রত পাল, সহকারী পুলিশ সুপার আব্দুল আল মামুন শাওন, জেলা ডিবির ওসি হাসিবুল্লাহ হাবিব এবং নিয়ামতপুর থানার ওসি মাহবুবুর রহমান।
এই গল্প শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের নয়—এটি লোভ, বিশ্বাসঘাতকতা আর সম্পর্কের ভাঙনের এক শিহরণ জাগানো প্রতিচ্ছবি।
