জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগমের দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমকে ঘিরে একের পর এক প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. অলিউল ইসলাম ও মোস্তফা হোসাইন ফুয়াদসহ কয়েকজন কর্মকর্তার প্রভাবেই সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ তাদের ‘চেয়ারম্যানের আস্থাভাজন’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। এমনকি অভিযোগ উঠেছে, চেয়ারম্যানের দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমেও তাদের প্রভাব রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. অলিউল ইসলামকে প্রায়ই অফিস চলাকালীন চেয়ারম্যানের দপ্তরে অবস্থান করতে দেখা যায়। চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগমের সঙ্গে সরকারি গাড়িতে করে মন্ত্রণালয়ে যাতায়াতের বিষয়টিও সংশ্লিষ্টদের নজরে এসেছে। এসব কারণে জাগৃকের ভেতরে অলিউল ইসলামকে চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে আলোচনা করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, অলিউল ইসলাম ও মোস্তফা হোসাইন ফুয়াদের ভূমি শাখায় পদায়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার পেছনেও চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ মহলের ভূমিকা রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
দুদকের মামলায় অভিযুক্ত, তবু পেলেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. অলিউল ইসলামকে ঘিরে আরও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে তার নাম রয়েছে এবং মামলাটি চলমান। এমন অবস্থায় তাকে নির্বাহী প্রকৌশলী, প্ল্যানিং-এর চলতি দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগমের আস্থাভাজন হওয়ায় মামলার বিষয়টি উপেক্ষা করেই তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চেয়ারম্যান বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তিন দিনের ব্যবধানে চেয়ারম্যান পদে ফেরত—উঠছে প্রশ্ন
চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগমের পদে থাকা ও পুনর্বহাল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জাগৃকের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।
২৬ এপ্রিল ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের এক আদেশে মোহাম্মাদ হাবিবুর, অতিরিক্ত সচিবকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে ফেরদৌসী বেগম কীভাবে আবার চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ফিরে এলেন এবং কোন ক্ষমতাবলে তার পুনর্বহাল হলো—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ফেরদৌসী বেগমের প্রভাব ও ক্ষমতার পরিধি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে।
যুগ্ম সচিব হয়েও সিনিয়র অতিরিক্ত সচিবের পদে—অভিযোগ
ফেরদৌসী বেগমের পদায়ন ও দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনি যুগ্ম সচিব পদমর্যাদায় থাকা অবস্থায় সিনিয়র অতিরিক্ত সচিবের পদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে তার ভূমিকা নিয়েও প্রশাসনের ভেতরে আলোচনা তৈরি হয়।
তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট নথি ও সরকারি তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
৩২ বাণিজ্যিক প্লটের বিজ্ঞপ্তি ঘিরে তোলপাড়
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মিরপুর চিড়িয়াখানা রোড এলাকার ৩২টি বাণিজ্যিক প্লটের বরাদ্দ বিজ্ঞপ্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় তদন্ত, যাচাই-বাছাই এবং আইনগত মতামত গ্রহণ না করেই এসব প্লটের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে জাগৃকের ভেতরে তখন থেকেই নানা আলোচনা শুরু হয়। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তড়িঘড়ি করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়ে থাকতে পারে।
বিভিন্ন প্লট নিয়ে অভিযোগ ও আপত্তি থাকা সত্ত্বেও সেগুলো আমলে না নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। এমনকি অভিযোগ নিষ্পত্তি না করেই কয়েকটি প্লটের বরাদ্দপত্র দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
মৃত বন্দে আলীর জমি নিয়েও প্রশ্ন
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেকশন-১, ব্লক-জি, হোল্ডিং নম্বর ১/১-এর মৃত বন্দে আলীর নামে থাকা জমির একটি অংশ নিয়েও জটিলতা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট নথির তথ্য অনুযায়ী, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধিগ্রহণ শাখা-১০ থেকে ৫ ডিসেম্বর ৩০ শতাংশ জমি অবমুক্ত করা হয়। এর আগে ২০০২ সালের ২৯ আগস্টের স্মারক এবং পরবর্তীতে ১৫ ডিসেম্বর ২০০২ তারিখে প্রকাশিত গেজেটের বিষয়টিও নথিতে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট নথিতে ১৩/৫৯/৬০ নম্বর এল/এ মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নোটিশ জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানোর তথ্যও রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। বিষয়টি জাগৃকের সংশ্লিষ্ট ফাইলেও সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানা গেছে।
মৃত বন্দে আলীর ছেলে জাহাঙ্গীরের দাবি, তার বাবা ২০১৩ সাল পর্যন্ত ওই জমির খাজনা পরিশোধ করেছেন। জমিতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগও ছিল বলে তিনি জানিয়েছেন। এ-সংক্রান্ত পার্ট ফাইল নম্বর ১০৬/১৩ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা অবস্থায় প্লটের শ্রেণি পরিবর্তন?
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২০২৫ সালেও ওই জমি নিয়ে আদালতে মামলা ও অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, জমিটির ওপর পূর্ববর্তী মালিকপক্ষের ভাড়াটিয়া ও উত্তরাধিকারীদের দাবি এবং আদালতের কার্যক্রম চলমান থাকা অবস্থায় কীভাবে শিল্প ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিকে বাণিজ্যিক প্লট হিসেবে দেখিয়ে টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি ও বরাদ্দপত্র দেওয়া হলো—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এ ঘটনায় মৃত বন্দে আলী মিয়ার ওয়ারিশরা চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন বলেও জানা গেছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কার্যকর সমাধান হয়নি বলে দাবি তাদের।
‘আস্থাভাজন’ কর্মকর্তাদের নিয়েই সিন্ডিকেটের অভিযোগ
চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পাশাপাশি তাকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি, দায়িত্ব পরিবর্তন কিংবা সাময়িক বরখাস্তের মতো প্রশাসনিক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। বিপরীতে অলিউল ইসলাম ও ফুয়াদের মতো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল রয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এ কারণে জাগৃকের অভ্যন্তরে এক ধরনের ‘দুই নীতি’র প্রশাসনিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে—যেখানে চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত কর্মকর্তারা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব নিয়েও নানা আলোচনা
চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগমের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ও প্রশাসনিক প্রভাব নিয়েও জাগৃকের ভেতরে নানা আলোচনা রয়েছে। কেউ কেউ তাকে জামায়াত-ঘনিষ্ঠ হিসেবে দাবি করলেও এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি প্রমাণ বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে তার আচরণ নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘরানার ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়া এবং ফ্ল্যাট বা প্লট বরাদ্দে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ছাড়া সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তৎকালীন সচিব নজরুল ইসলামের ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ দাবি করছেন, প্রশাসনের ভেতরে প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতা পাওয়ার কারণেই ফেরদৌসী বেগম দীর্ঘ সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
‘ক্ষমতার উৎস’ নিয়ে প্রশ্ন
ফেরদৌসী বেগমের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। কেউ কেউ তার অতীত প্রশাসনিক ক্যারিয়ার ও বিভিন্ন সরকারের সময়ে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি সামনে আনছেন। আবার কেউ কেউ তার পারিবারিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগকে তার প্রভাবের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
এমনকি সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে—‘ক্ষমতার উৎস কোথায়’—তা নিয়েও। তবে এসব বক্তব্যের বেশিরভাগই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি ও অভিমতের পর্যায়ে রয়েছে; স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা নিজেদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করছেন। বিশেষ করে অলিউল ইসলাম ও মোস্তফা হোসাইন ফুয়াদের ভূমিকা নিয়ে জাগৃকের বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
সব মিলিয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্লট বরাদ্দ, পদায়ন, দায়িত্ব বণ্টন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম, নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. অলিউল ইসলাম ও মোস্তফা হোসাইন ফুয়াদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পাওয়া গেলে পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে সংযুক্ত করে প্রকাশ করা হবে। বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে…………….
