জাতীয় সংসদের সাউন্ড সিস্টেম বিপর্যয়ের ঘটনায় অভিযুক্ত গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেনকে ঘিরে বিতর্ক থামছেই না। বরং সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রশ্ন যুক্ত হচ্ছে—অভিযোগের পরও কেন দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেই? আর কীভাবে তিনি গড়ে তুললেন কোটি টাকার সম্পদের পাহাড়?
গত ১২ মার্চ দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভয়াবহ সাউন্ড সিস্টেম বিভ্রাটের ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ পর্যন্ত হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করতে বাধ্য হন—যা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের জন্য এক বিব্রতকর পরিস্থিতি হিসেবে দেখা হয়।
অভিযোগের পরও অগ্রগতি নেই- ঘটনার পর সরঞ্জাম ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণে অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যদিও চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি প্রকাশ্যে ‘কঠোর ব্যবস্থা’র আশ্বাস দিয়েছেন, বাস্তবে তার প্রতিফলন এখনো অনুপস্থিত।
গণপূর্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনকে শাস্তি না দিয়ে বরং ঢাকার ভেতরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বদলি করা হয়েছে। এতে করে অভ্যন্তরীণভাবে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।
সম্পদের পাহাড়: প্রশ্নের কেন্দ্রে আনোয়ার। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মো. আনোয়ার হোসেনের নামে রয়েছে একাধিক মূল্যবান সম্পদ। এর মধ্যে— উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরে প্রায় ৩০০০ বর্গফুটের দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, পশ্চিম আগারগাঁওয়ে একটি চারতলা ভবন, বনশ্রী আমুলিয়া হাউজিং এলাকায় ১০ কাঠার প্লট। এই সম্পদের বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তার সরকারি আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের তথ্য মতে তার সরকারি আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
টেন্ডার সিন্ডিকেটের অভিযোগ- গণপূর্তের ভেতরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য ও বদলি প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করছে—এমন অভিযোগও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, আনোয়ার হোসেন এই সিন্ডিকেটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সবাই জানে কী হচ্ছে, কিন্তু কেউ মুখ খোলে না। কারণ, এই চক্রের প্রভাব অনেক গভীর।
দুদকে অভিযোগ, তবে নীরব অগ্রগতি
গত ২ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশনে আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষ গ্রহণ ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগ জমা পড়ে। অভিযোগপত্রে তার সম্পদের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে তদন্তের দাবি জানানো হয়।
তবে অভিযোগ জমা দেওয়ার পরও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
বদলি না শাস্তি?
১ এপ্রিল প্রধান প্রকৌশলী মোঃ খালেকুজ্জামান চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে আনোয়ার হোসেনকে গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-১২, ঢাকায় বদলি করা হয়।
প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, নাকি ‘নিরাপদ পুনর্বাসন’?
বাড়ছে চাপা ক্ষোভ- গণপূর্তের ভেতরে ও বাইরে এখন একটাই দাবি—স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় এমন অনিয়ম শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এখন দেখার বিষয়—অভিযোগগুলো কি তদন্তের আলো দেখবে, নাকি আগের মতোই নীরবতার আড়ালে চাপা পড়ে যাবে?
