বৃহস্পতিবার, ৭ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বেতন ৮০ হাজার, বসবাস ১২ কোটি টাকার ফ্ল্যাটে—এনবিআর কর্মকর্তা শাহ মারুফকে ঘিরে তোলপাড়

স্টাফ রিপোর্টার
মে ৭, ২০২৬ ১:৪৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর বিভাগের অতিরিক্ত কর কমিশনার (এসিটি-চলতি দায়িত্ব) শাহ মোহাম্মদ মারুফকে ঘিরে উঠেছে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ। সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে তার মাসিক বেতন প্রায় ৮০ হাজার টাকা হলেও রাজধানীর বারিধারা কূটনৈতিক জোনে ১২ কোটি টাকার বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস, কোটি টাকার ব্যাংক জমা, দামি গাড়ি এবং নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের তথ্য সামনে আসায় এনবিআরের ভেতরে-বাইরে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড়।

২০১০ সালে ২৮তম বিসিএসের মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেওয়া শাহ মোহাম্মদ মারুফ বর্তমানে ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার আয়কর নথিতে সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে চার কোটি এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা। তবে কর গোয়েন্দাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানে তার নিজ, স্ত্রী ও স্বজনদের নামে প্রায় ৩০ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বৈধ আয়ের সঙ্গে যার কোনো সামঞ্জস্য নেই।

এনবিআরের কর গোয়েন্দা ইউনিট ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। কর গোয়েন্দা ইউনিটের কমিশনার আব্দুর রকিব তদন্তের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, সপ্তাহখানেকের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। যদিও তদন্তের স্বার্থে এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গোপালগঞ্জের রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতাসীন বলয়ের ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শাহ মারুফ দ্রুত প্রভাবশালী কর্মকর্তা হয়ে ওঠেন। মাত্র সাত-আট বছরের ব্যবধানে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ অভিযোগের সত্যতা নিয়ে আলোচনা চললেও এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বর্তমানে তিনি বগুড়া কর অঞ্চলের সিরাজগঞ্জ সার্কেলে বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বারিধারা কূটনৈতিক এলাকার যে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে তিনি বসবাস করছেন, সেটি তার স্ত্রীর নামে কেনা হলেও এখনো নিবন্ধন সম্পন্ন হয়নি। প্রায় আড়াই বছর আগে ফ্ল্যাটটি কেনার পর পরিবারসহ সেখানে উঠেন তিনি। ভবন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় প্রতি বর্গফুটের মূল্য প্রায় ৪০ হাজার টাকা, ফলে ফ্ল্যাটটির বাজারমূল্য দাঁড়ায় ১২ কোটিরও বেশি। শুধু ফ্ল্যাটই নয়, অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায়ও ব্যয় হয়েছে কয়েক কোটি টাকা। দামি আসবাবপত্র, বিদেশি বাথরুম ফিটিংস ও ব্যয়বহুল ইন্টেরিয়র ডিজাইনে সাজানো হয়েছে পুরো বাসা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তার স্ত্রী সাদিয়া আফরিন এক সময় একটি বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। আয়কর নথিতে তিনি ইউনিয়ন ডেভেলপমেন্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ থাকলেও বর্তমানে তিনি গৃহিণী। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রায় এক বছর আগে চাকরি ছেড়েছেন সাদিয়া। অথচ তার আয়কর নথিতে সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে এক কোটি ৭৮ লাখ টাকা। প্রশ্ন উঠেছে, বৈধ আয়ের সীমিত উৎস থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তার নামে ১২ কোটি টাকার ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব হলো।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শাহ মারুফ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে সম্পদ কিনেছেন। কর অঞ্চল-৪, কর অঞ্চল-৫, কর অঞ্চল-১২ ও নারায়ণগঞ্জ সার্কেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালনকালে তিনি কর ফাঁকিতে সহায়তা করে বিপুল অবৈধ অর্থ সংগ্রহ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কর অঞ্চল-৫-এ দায়িত্ব পালনকালে অসাধু উপায়ে তার সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতিবাজ কর কর্মকর্তারা যেমন বড় ব্যবসায়ীদের কর ফাঁকিতে সহায়তা করেন, তেমনি নিজের অবৈধ আয় বৈধ করতে আয়কর নথিতেও জালিয়াতির আশ্রয় নেন। তার ভাষায়, যদি কর গোয়েন্দারা অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পেয়ে থাকে, তাহলে তাকে অবশ্যই বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি দুদকেরও প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

সাবেক আয়কর কমিশনার ড. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তার পক্ষে শুধুমাত্র চাকরির বেতনে এত সম্পদের মালিক হওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তদন্তে অবৈধ সম্পদের প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে শাহ মোহাম্মদ মারুফের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। বারিধারার বাসভবনে গিয়েও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

সরকারি চাকরির সীমিত আয়ের বিপরীতে বিপুল সম্পদ, বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং কর ফাঁকিতে সহায়তার অভিযোগ—সব মিলিয়ে শাহ মোহাম্মদ মারুফকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের বিতর্ক। এখন নজর তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে—সেখানে আদৌ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ আসে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।