নারায়ণগঞ্জের একটি খামারে এই মহিষটির নাম রাখা হয়েছে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। ছবি: এএফপি
ঠিক পাঁচ বছর আগে, ২০২১ সালের মে মাসে ১২ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিল ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ও ইসরায়েল। সেই বছরের ঈদুল আজহায় গাজীপুরের এক খামারে কোরবানির গরুর নাম রাখা হয়েছিল ‘হামাস’।
সময় বদলেছে, কিন্তু নামকরণের রাজনীতি বদলায়নি। বরং ডিজিটাল যুগে তা আরও তীক্ষ্ণ, আরও কৌশলী হয়েছে। এবার নারায়ণগঞ্জের এক খামারে দেখা মিলেছে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের বিশাল ধবল মহিষের। আরেকটির নাম ‘নেতানিয়াহু’। কোথাও আছে ‘মোদি মহিষ’। আবার ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তাপে যশোরে এক গরুর নাম রাখা হয়েছে ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমারের নামে।
খামারে অ্যালবিনো মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের’ চুল আঁচড়ে দেন এক ব্যক্তি। ১৭ মে নারায়ণগঞ্জে। ছবি: এএফপি
প্রথম দেখায় বিষয়টি নিছক বিনোদন মনে হতে পারে। কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায়— কোরবানির পশুর নামকরণ এখন শুধু হাস্যরস নয়; এটি মনস্তত্ত্ব, প্রতীকী প্রতিবাদ, ভাইরাল মার্কেটিং এবং ডিজিটাল অর্থনীতির এক জটিল মিশ্রণ।
মনোযোগই এখন সবচেয়ে বড় পুঁজি
আধুনিক পৃথিবীতে তথ্যের অভাব নেই, অভাব মানুষের মনোযোগের। আর যে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে, অর্থও সেদিকেই প্রবাহিত হয়— এটিই ‘অ্যাটেনশন ইকোনমি’র মূল তত্ত্ব।
কোরবানির পশুর হাটে আনা হয়েছে গরু। শুক্রবার রাজধানীর ধোলাইখালে। ছবি: ফোকাস বাংলা
নারায়ণগঞ্জের সেই ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষ তার বড় উদাহরণ। অ্যালবিনো জাতের ধবধবে সাদা মহিষটি দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় করেছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এটি খবর হয়েছে। ফ্রান্সের টিএফওয়ান-এর ফেসবুক পেজে মহিষটি নিয়ে প্রকাশিত একটি রিল কয়েক মিলিয়নের বেশি মানুষ দেখেছেন।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৭০০ কেজি ওজনের মহিষটি লাইভ ওয়েটে প্রতি কেজি ৫৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। মোট দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।
বাংলাদেশে ঈদুল আজহাকে ঘিরে গবাদিপশুর বাজার এখন হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত বছর দেশে ৯১ লাখের বেশি পশু কোরবানি হয়েছে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আলাদা করে নজর কাড়তে ‘ভাইরাল নাম’ এখন এক কার্যকর বিপণন কৌশল।
খামারিরাও যুক্তি দিচ্ছেন— মহিষটির মাথার সোনালি চুলের মতো অংশের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুলের মিল থাকায় এ নাম দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নামটাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন।
নারায়ণগঞ্জের খামারে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের মহিষ। ছবি: এএফপি
ভাইরাল হওয়ার কারখানা: সোশ্যাল মিডিয়া
আজকের কোরবানির হাট শুধু বাস্তবের বাজার নয়, এটি ডিজিটাল কনটেন্টেরও উৎস। ইউটিউবার, ফেসবুক ইনফ্লুয়েন্সার ও শর্ট ভিডিও নির্মাতারা এখন পশুর হাটের অন্যতম চালিকাশক্তি।
অস্বাভাবিক, মজার কিংবা বিতর্কিত কিছু দেখলেই সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদম সেটিকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয় লাখো মানুষের ফিডে। ফলে ‘ট্রাম্প মহিষ’ বা ‘মোদি মহিষ’ নামগুলো সাধারণ পশুকে মুহূর্তেই ভাইরাল চরিত্রে পরিণত করে।
দর্শনার্থীরাও স্বীকার করছেন— সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও দেখে তারা খামারে গিয়েছেন শুধু সেই মহিষটি একবার দেখার জন্য।
কোরবানির হাটে রাজনীতির গোপন ভাষা
এখানেই বিষয়টি শুধু মার্কেটিংয়ে আটকে থাকে না; ঢুকে পড়ে রাজনীতি ও প্রতীকী ব্যঙ্গ।
ব্রিটিশ দৈনিক টেলিগ্রাফে প্রকাশিত প্রতিবেদনটির মন্তব্যঘরে একজন লিখেছেন, “Make Cattle Great Again”— যা ট্রাম্পের বিখ্যাত রাজনৈতিক স্লোগান “Make America Great Again”-এর ব্যঙ্গাত্মক রূপ।
আবার পাকিস্তানের ডন পত্রিকার মন্তব্যে কেউ লিখেছেন, “মহিষটির সঙ্গে ট্রাম্পের পার্থক্য হলো— মহিষটির নাম এপস্টেইন ফাইলে নেই।
এই মন্তব্যগুলো দেখায়, মানুষ আসলে পশুর নামের ভেতর দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান, ক্ষোভ ও বিদ্রূপ প্রকাশ করছে।
বাখতিনের ‘কার্নিভালেস্ক’ ও উল্টে যাওয়া ক্ষমতা
রুশ দার্শনিক মিখাইল বাখতিন ‘কার্নিভালেস্ক’ তত্ত্বে বলেছিলেন— মেলা বা কার্নিভাল এমন এক সাময়িক জগৎ, যেখানে সমাজের ক্ষমতা, শ্রেণি ও ভয়ের কাঠামো উল্টে যায়। রাজা হয়ে যায় হাস্যরসের চরিত্র, আর সাধারণ মানুষ পায় প্রতীকী ক্ষমতা।
বাংলাদেশের কোরবানির পশুর হাট যেন সেই তত্ত্বের বাস্তব সংস্করণ।
একজন সাধারণ খামারি যখন তার মহিষের নাম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ বা ‘নেতানিয়াহু’ রাখেন, তখন তিনি আসলে বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে প্রতীকীভাবে দড়িতে বাঁধা এক প্রাণীতে রূপান্তর করেন।
যাদের বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বলা সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব, তাদের নিয়েই তৈরি হয় ব্যঙ্গ, হাস্যরস ও প্রতীকী প্রতিরোধ।
এ যেন ক্ষমতার বিরুদ্ধে নিঃশব্দ বিদ্রোহ— যেখানে রাজনীতি ঢুকে পড়ে কোরবানির হাটের বাঁশের খুঁটি, মাটির গন্ধ আর মোবাইল ক্যামেরার ফ্রেমে।
ইতিহাসজুড়ে পশু দিয়ে ব্যঙ্গের রাজনীতি
বিশ্ব ইতিহাসে ক্ষমতাধরদের পশুর সঙ্গে তুলনা করে ব্যঙ্গ করার বহু নজির আছে।
ফরাসি বিপ্লবের সময় রানি মেরি অ্যান্টোয়েনেটকে চিতাবাঘ হিসেবে আঁকা হতো, যাতে তাকে ভয়ংকর ও অমানবিক হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। রাজা ষোড়শ লুই ও রাজপরিবারকে দেখানো হতো শুকরের পাল হিসেবে— লোভ ও ভোগের প্রতীক হিসেবে।
জর্জ অরওয়েলের উপন্যাস ‘অ্যানিমেল ফার্ম’-এর প্রচ্ছদ। ছবি: আমাজন ডটকমের সৌজন্যে
জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত উপন্যাস Animal Farm-এও স্বৈরতন্ত্রকে রূপকভাবে দেখানো হয়েছে খামারের পশুদের মাধ্যমে। সেখানে ক্ষমতালোভী শাসকের প্রতীক ছিল শুকর।
এমনকি সাম্প্রতিক সময়েও পরিবেশবাদীরা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানকে ব্যঙ্গ করতে একটি উভচর প্রাণীর বৈজ্ঞানিক নাম রেখেছেন Dermophis donaldtrumpi।
কোরবানির হাট: বাজার, ব্যঙ্গ ও ভাইরাল রাজনীতির নতুন মঞ্চ
সব মিলিয়ে কোরবানির পশুর নামকরণ এখন আর নিছক মজার বিষয় নয়। এটি একই সঙ্গে ব্যবসায়িক কৌশল, ডিজিটাল কনটেন্ট, রাজনৈতিক ব্যঙ্গ এবং সামাজিক মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন।
একটি নাম— ‘ট্রাম্প’, ‘মোদি’ বা ‘নেতানিয়াহু’— মুহূর্তেই একটি সাধারণ মহিষকে পরিণত করছে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে।
আর সেই নামের আড়ালে উঠে আসছে মানুষের ক্ষোভ, বিনোদন, প্রতিবাদ, কৌতূহল এবং সবচেয়ে বড় কথা— মনোযোগের জন্য এক নির্মম প্রতিযোগিতা।
