২০২৩ সালে দুদকের অনুসন্ধান, বক্তব্য গ্রহণের নোটিশ ঘিরে প্রশ্ন—অভিযোগের বর্তমান অবস্থা কী?। ফাইল ছবি
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সময়ের সঙ্গে এসব অভিযোগের তালিকায় নতুন নতুন নাম যুক্ত হলেও অভিযোগের নিষ্পত্তি, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এবার নতুন করে আলোচনায় এসেছেন রাজউকের দুই কর্মচারী বি এম কাইয়ুম ও মোশাররফ হোসেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে তাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হলেও তাঁরা নিজ নিজ পদে বহাল রয়েছেন। অভিযোগগুলোর বিষয়ে কী ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, আদৌ কোনো বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বর্তমান অবস্থা কী—তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বি এম কাইয়ুম বর্তমানে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর (এস্টেট-৪) পদে এবং মোশাররফ হোসেন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর (স্কাই-তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, ডিজাইন) পদে কর্মরত রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানা গেছে, বি এম কাইয়ুম দেবিদ্বার উপজেলার লতিফা খাতুনের ছেলে এবং মোশাররফ হোসেন পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার গুলশান বেগমের ছেলে। তাঁদের ঘিরে নতুন করে আলোচনার পেছনে রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ২০২৩ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ নোটিশ, যেখানে রাজউকের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের বিষয়টি উঠে এসেছে।
দুদকের ২০২৩ সালের নোটিশে অনুসন্ধানের তথ্য
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়, ১ সেগুনবাগিচা, ঢাকা থেকে ২৬ জুন ২০২৩ তারিখে একটি নোটিশ জারি করা হয়। নোটিশের বিষয় ছিল—‘অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য শ্রবণ ও গ্রহণ প্রসঙ্গে’।
নোটিশে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২২ ধারা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা, ২০০৭-এর ৮ বিধির উল্লেখ রয়েছে। এতে বলা হয়, রাজউকের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়েছে।
অনুসন্ধান টিমে নেতৃত্বে ছিলেন একজন কর্মকর্তা। সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন উপপরিচালক জেসমিন আক্তার ও উপপরিচালক মো. তানজির হাসিব সরকার।
বক্তব্য গ্রহণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুদকে হাজির হওয়ার নির্দেশনা
দুদকের ওই নোটিশে অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্ধারিত তারিখ ও সময়ে তাঁদের দুদকের প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট ও টিআইএন সার্টিফিকেটের কপি সঙ্গে আনার কথাও নোটিশে উল্লেখ ছিল।
অর্থাৎ, ২০২৩ সালে রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দুদক তাঁদের বক্তব্য গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছিল।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বক্তব্য গ্রহণের জন্য নোটিশ জারি করা মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। আবার সরবরাহ করা নথির অস্পষ্ট অংশ থেকে ওই অনুসন্ধানসংক্রান্ত নোটিশে বি এম কাইয়ুম ও মোশাররফ হোসেনের নাম ছিল কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। ফলে তাঁদের নামকে ওই নির্দিষ্ট অনুসন্ধানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট নথির পূর্ণাঙ্গ কপি যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগের পরও বহাল, প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের দাবি, বি এম কাইয়ুম ও মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে পূর্বেও একাধিক অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এরপরও তাঁরা নিজ নিজ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে রাজউক প্রশাসন কী পদক্ষেপ নিয়েছে, কোনো বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছিল কি না কিংবা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে কী অগ্রগতি হয়েছে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রয়োজন।
এখানেই সামনে আসছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্ব কী? অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না? তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না?
রাজউকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উত্থাপনের দাবি রয়েছে, সেসব অভিযোগের নিরপেক্ষ যাচাই এবং তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুদক ও রাজউক প্রশাসনের কাছে যেসব প্রশ্ন
বি এম কাইয়ুম ও মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে পূর্বে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বর্তমান অবস্থা কী? তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় তদন্ত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে কি?
২০২৩ সালে দুদকের রাজউক-সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানে তাঁদের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া গিয়েছিল কি না? ওই অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য গ্রহণের পর কী অগ্রগতি হয়েছিল?
অভিযোগগুলোর বিষয়ে অনুসন্ধান বা তদন্ত হয়ে থাকলে তার ফলাফল কী? অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে কি?
এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর পাওয়া গেলে অভিযোগের প্রকৃত অবস্থা এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ সম্পর্কে জনমনে তৈরি হওয়া সংশয় অনেকটাই দূর হতে পারে।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও নথি যাচাইয়ের দাবি
রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পক্ষপাত বা প্রভাব যেন কাজ না করে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। বি এম কাইয়ুম ও মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোও একইভাবে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার দাবি উঠেছে।
অভিযোগকারীরা দুদক ও রাজউক প্রশাসনের কাছে সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ, প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই ছাড়া কাউকে দায়ী করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ার পর সেগুলো দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থাকাও কাম্য নয়। জনস্বার্থে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের।
এসব অনিয়মের অভিযোগসহ জাল সার্টিফিকেটে চাকরি হারানো, অবৈধভাবে টাকা উপার্জন বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে……….
