বৃহস্পতিবার, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রাজউকের নিরীক্ষা শাখায় ‘টুম্পা সিন্ডিকেট’, ফাইল আটকে ঘুষ-হয়রানির অভিযোগ, মাসিক অর্থ আদায়ের দাবিও

নিজস্ব প্রতিবেদক
সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬ ১১:০১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নিরীক্ষা শাখার সহকারী পরিচালক নাদিয়া আহমেদ টুম্পার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, ফাইল আটকে রাখা, গ্রাহক হয়রানি এবং ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, তাঁকে ঘিরে রাজউকের নিরীক্ষা শাখায় একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে, যাকে কেউ কেউ ‘টুম্পা সিন্ডিকেট’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ফ্ল্যাট হস্তান্তর, নামজারি, জমির মালিকানা পরিবর্তন, কমিশন, জমি তদন্ত ও হাজিরাসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনানুষ্ঠানিক অর্থ দাবি করা হয়। এমনকি কিছু ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মাসিক ভিত্তিতে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ নেওয়ার দাবিও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগগুলোর সবকটির পক্ষে এখনো নথিভিত্তিক ও স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগ, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, পূর্বে প্রকাশিত তথ্য এবং সরকারি নথি—প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।

সরকারি তালিকায় টুম্পার পদ নিশ্চিত

রাজউকের সরকারি কর্মকর্তা তালিকায় নাদিয়া আহমেদ টুম্পাকে সহকারী পরিচালক (নিরীক্ষা) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই তালিকায় তাঁর দাপ্তরিক ই-মেইল ও মোবাইল নম্বরও প্রকাশ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, তিনি রাজউকের নিরীক্ষা শাখায় দায়িত্ব পালন করছেন—এ বিষয়টি সরকারি তথ্যেই নিশ্চিত। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ, ফাইল আটকে অর্থ আদায় কিংবা ‘সিন্ডিকেট’ পরিচালনার অভিযোগের সত্যতা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগের ধরন একাধিক

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সূত্রগুলোর কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগগুলো মূলত কয়েকটি ভাগে বিভক্ত।

প্রথমত, ফ্ল্যাট হস্তান্তর, নামজারি, জমির মালিকানা পরিবর্তন ও কমিশন-সংক্রান্ত ফাইল অনুমোদন বা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অর্থ দাবির অভিযোগ।

দ্বিতীয়ত, জমি তদন্ত বা কমিশনের কার্যক্রমের নামে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার দাবি।

তৃতীয়ত, রাজউকে হাজিরা কিংবা সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য ৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ দেওয়ার অভিযোগ।

চতুর্থত, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মাসে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়মিত ‘মাসোহারা’ নেওয়ার দাবি।

পঞ্চমত, অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফাইল আটকে রাখা, নতুন আপত্তি তৈরি করা কিংবা ভুল তথ্যসংবলিত চিঠি দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ।

পুরোনো প্রতিবেদনেও উঠেছিল একই অভিযোগ

২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে নাদিয়া আহমেদ টুম্পার বিরুদ্ধে প্রায় একই ধরনের অভিযোগের কথা উঠে এসেছিল। সেখানে ফাইল আটকে রাখা, তদন্ত ও হাজিরার নামে অর্থ নেওয়া এবং ডেভেলপারদের কাছ থেকে মাসিক অর্থ আদায়ের দাবি করা হয়েছিল।

তবে ওই প্রতিবেদনেও অভিযোগগুলোর স্বাধীন ও নথিভিত্তিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

ফলে অভিযোগগুলো নতুন নয়—এমন দাবি করা গেলেও সেগুলো সত্য কি না, তা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন আরও গভীর নথি যাচাই ও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য।

ফাইল আটকে রাখার অভিযোগ, এরপর নতুন আপত্তি

অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এসেছে রাজউক থেকে সেবা নিতে যাওয়া ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে।

তাঁদের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি ফাইলের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকার পরও সেটি দীর্ঘদিন আটকে থাকে। পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পর নতুন আপত্তি কিংবা অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হয়। এরপর অর্থের বিনিময়ে কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়—এমন অভিযোগও রয়েছে।

কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দাবি করেছেন, জমি তদন্ত কিংবা কমিশনের কাজে তাঁদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা চাওয়া হয়েছে। আবার কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, রাজউকে হাজিরা দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনানুষ্ঠানিক অর্থ দিতে হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়, ফাইল নম্বর, অর্থ প্রদানের প্রমাণ, নোটশিট ও সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথি যাচাই করা প্রয়োজন। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কারও বক্তব্য পাওয়া গেলেই সেটিকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।

নথিতেই মিলতে পারে অভিযোগের আসল চিত্র

এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—যেসব ফাইল নিয়ে অর্থ দাবির অভিযোগ উঠেছে, সেসব ফাইলের নোটশিটে কী রয়েছে?

কোনো ফাইল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে যাওয়ার পর কতদিন পড়ে ছিল, কখন আপত্তি দেওয়া হয়েছে, কী কারণে অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত কখন সেটি নিষ্পত্তি হয়েছে—এসব তথ্য পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে অভিযোগের নথিভিত্তিক চিত্র পাওয়া সম্ভব।

একইভাবে ভুল তথ্যসংবলিত চিঠি দেওয়ার অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট চিঠির মূল কপি, পরবর্তী সংশোধিত চিঠি এবং সংশ্লিষ্ট নোটশিট পাশাপাশি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

‘সিন্ডিকেট’—নেটওয়ার্কের প্রমাণ কোথায়?

অভিযোগের সঙ্গে ‘টুম্পা সিন্ডিকেট’ শব্দটি ব্যবহৃত হলেও এই নেটওয়ার্কে কারা জড়িত, তাঁদের ভূমিকা কী এবং অর্থের প্রবাহ কীভাবে পরিচালিত হয়—এ বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত নথিভিত্তিক তথ্য পাওয়া যায়নি।

যদি নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা, তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফাইল, ফাইল নিষ্পত্তির সময়কাল, কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অর্থ লেনদেনের ধরন যাচাই করা প্রয়োজন।

একইভাবে জমি তদন্ত বা কমিশনের নামে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং হাজিরার নামে ৫ থেকে ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ থাকলে রসিদ, ব্যাংক লেনদেন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের তথ্য, মধ্যস্থতাকারীর যোগাযোগ কিংবা প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য—এসব প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

মাসে কোটি টাকা লেনদেনের দাবি, প্রমাণ কোথায়?

অভিযোগের সবচেয়ে বড় দাবিগুলোর একটি হলো—এই কথিত চক্রের মাধ্যমে মাসে কোটি টাকার বেশি অর্থ লেনদেন হয়।

কিন্তু এই দাবির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—অর্থ আসে কোথা থেকে এবং যায় কোথায়?

ডেভেলপারদের কাছ থেকে মাসে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়—এমন দাবি সত্য হলে প্রথমেই শনাক্ত করতে হবে কতটি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত অর্থ দেয়। এরপর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাইল সংখ্যা, নিষ্পত্তির সময়, কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অর্থ প্রদানের ধরন যাচাই করা প্রয়োজন।

শুধু ‘কোটি টাকা লেনদেন হয়’—এমন সূত্রের বক্তব্য দিয়ে অর্থের পরিমাণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অর্থের প্রবাহ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন লেনদেনের নথি, একাধিক স্বাধীন সূত্র এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি ফাইলের সঙ্গে তথ্যের মিল।

রাজউকের কাছে বড় প্রশ্ন

নাদিয়া আহমেদ টুম্পার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ আগে লিখিতভাবে করা হয়েছিল কি না—এখন সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অভিযোগ হয়ে থাকলে তার ভিত্তিতে কোনো তদন্ত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও জানা প্রয়োজন।

রাজউকের কাছে জানতে হবে—

তাঁর বিরুদ্ধে কোনো লিখিত বিভাগীয় অভিযোগ রয়েছে কি না।

কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল কি না।

কোনো অডিট আপত্তি বা প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণ রয়েছে কি না।

অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে কখনো দায়িত্ব থেকে সরানো বা বদলি করা হয়েছিল কি না।

তাঁর অধীনে নিষ্পত্তি হওয়া ফাইলের কোনো নমুনা অডিট করা হয়েছে কি না।

এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর বাস্তব ভিত্তি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

পাওয়া যায়নি বিভাগীয় তদন্ত বা শাস্তির নথি

অনুসন্ধানে নাদিয়া আহমেদ টুম্পার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, ফাইল আটকে অর্থ আদায় কিংবা ‘সিন্ডিকেট’ পরিচালনার অভিযোগের পক্ষে কোনো বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন, অডিট আপত্তি, শাস্তির আদেশ বা আদালতের নথি পাওয়া যায়নি।

তাই অভিযোগগুলোকে এই মুহূর্তে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই। বরং সংশ্লিষ্ট ফাইল, নোটশিট, দাপ্তরিক চিঠি, আর্থিক লেনদেন ও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের মাধ্যমে অভিযোগগুলো যাচাই করা প্রয়োজন।

টুম্পার বক্তব্য কী?

নাদিয়া আহমেদ টুম্পার বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগকারী পক্ষ জানিয়েছে। তবে ফোনে যোগাযোগ সম্ভব না হওয়ায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

একই সঙ্গে রাজউক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও প্রয়োজন। অভিযোগগুলো নিয়ে কর্তৃপক্ষ আগে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে কি না, কোনো তদন্ত হয়েছে কি না কিংবা সংশ্লিষ্ট ফাইলগুলো অডিট করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে রাজউকের বক্তব্য অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সামনে যে পাঁচ প্রশ্নের উত্তর জরুরি

নাদিয়া আহমেদ টুম্পার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে অন্তত পাঁচটি প্রশ্নের নথিভিত্তিক উত্তর প্রয়োজন—

১. কোন কোন ফাইল অর্থের বিনিময়ে আটকে রাখা বা ছাড়ার অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত?

২. অভিযোগকারী ভুক্তভোগীরা তাঁদের ফাইল নম্বর ও অর্থ লেনদেনের প্রমাণ দিতে পারবেন কি?

৩. রাজউকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত বা অডিটে কোনো অনিয়ম ধরা পড়েছে কি?

৪. অভিযোগের বিষয়ে রাজউক কর্তৃপক্ষ আগে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে কি?

৫. মাসে কোটি টাকা লেনদেনের দাবির পক্ষে আর্থিক বা নথিগত প্রমাণ কোথায়?

অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান

বর্তমানে সরকারি নথিতে নাদিয়া আহমেদ টুম্পার পদ ও কর্মস্থলের তথ্য নিশ্চিত করা গেলেও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ গ্রহণ, ফাইল আটকে অর্থ আদায় ও কথিত ‘সিন্ডিকেট’ পরিচালনার অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো পর্যাপ্ত স্বাধীন নথি পাওয়া যায়নি।

তাই এই অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নির্ধারণে রাজউকের সংশ্লিষ্ট ফাইল ও নোটশিট, অভিযোগকারীদের প্রত্যক্ষ বক্তব্য, অর্থ লেনদেনের তথ্য, দাপ্তরিক চিঠিপত্র এবং কর্তৃপক্ষের তদন্ত—সবকিছু একসঙ্গে যাচাই করা জরুরি।

বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী ফলোয়াপ প্রতিবেদনে। চলবে…

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।