পর্ব–১ | গোপন অনুশাসন, নথি গায়েবের অভিযোগ ও ভূমিদস্যু চক্রের কথিত তৎপরতা।
রাজধানীর অভিজাত গুলশান এলাকার একটি অত্যন্ত মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি বেসরকারি মালিকানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব কাজী ওয়াছিউদ্দিনের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট নথি, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দাবি করা হচ্ছে, গুলশান সিইএন(সি) ব্লকের ৯৮ নম্বর সড়কের ৬ নম্বর প্লট—যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা—তা সরকারি স্বার্থ উপেক্ষা করে বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
আইনজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি জমি বা প্লটসংক্রান্ত কোনো মামলায় নিম্ন আদালত কিংবা হাইকোর্টে রাষ্ট্রপক্ষ পরাজিত হলে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী উচ্চ আদালতে আপিল এবং প্রয়োজন হলে রিভিউ আবেদন করার বাধ্যবাধকতা থাকে। অতীতে সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় রাজউক ও গৃহায়ন মন্ত্রণালয় এমন বহু মামলায় ধারাবাহিকভাবে আইনি লড়াই চালিয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, আলোচিত এই প্লটের ক্ষেত্রে ১৯৭৬ সালে একটি রিট মামলায় সরকারের বিপক্ষে রায় হওয়ার পর রহস্যজনকভাবে আর কোনো আপিল বা পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
আরও অভিযোগ রয়েছে, মামলার বাদীও দীর্ঘ সময় রায় বাস্তবায়নের জন্য আদালতে কোনো আবেদন কিংবা আদালত অবমাননার মামলা করেননি। সংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি, নতুন করে আদালতে বিষয়টি উঠলে সরকারি নথিপত্র ও গেজেটের তথ্য সামনে আসতে পারত, যা মামলার গতিপথ পরিবর্তন করতে পারত। এ কারণেই আদালতের পরিবর্তে প্রশাসনিক পর্যায়ে বিভিন্ন তদবির ও প্রভাব খাটানোর চেষ্টা চলেছে বলে অভিযোগ।
অনুসন্ধানে আরও দাবি করা হয়েছে, ২০২৩ সালের জুনে তৎকালীন পূর্ত সচিব কাজী ওয়াছিউদ্দিন অত্যন্ত গোপনে একটি প্রশাসনিক অনুশাসনের মাধ্যমে রাজউককে সম্পত্তিটি বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, বিষয়টি সে সময়ের প্রতিমন্ত্রীকে অবহিত না করেই চূড়ান্ত অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হয়, যদিও এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উচ্চপর্যায়ের অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।
পরে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে মন্ত্রণালয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, নথি তলবের পর তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট ফাইল খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং পরে সেটি একটি তালাবদ্ধ আলমারি থেকে উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম বিভিন্ন সূত্রে উঠে এলেও, তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই এখনও সম্পন্ন হয়নি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সরকারি সম্পত্তি হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আবার অনুসন্ধানে আরও বলা হয়েছে, ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে প্লটটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত হয় এবং ১৯৭৩ সালে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে রাজউকের একাধিক নথি ও চিঠিতেও এ তথ্যের উল্লেখ ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তী সময়ে এসব গুরুত্বপূর্ণ নথির কিছু অংশ আর পাওয়া যায়নি।
চলবে—পর্ব–২-এ: আলোচিত প্লটের নথিপত্র, আদালতের রায়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নিয়ে আরও বিস্তারিত অনুসন্ধান প্রকাশিত হবে।
