চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ, তদন্ত ও বিচার দাবি স্বামীর। সমরিতা হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত
ফরিদপুরে সিজারিয়ান অপারেশনের পর এক প্রসূতির পেটের ভেতরে সার্জিক্যাল গজ-ব্যান্ডেজ রেখেই সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। অপারেশনের প্রায় ৫১ দিন পর রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ওই নারী। এ ঘটনায় চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ এনে সুষ্ঠু তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন নিহতের স্বামী।
নিহত নারীর নাম কনিকা মন্ডল। তিনি রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামের অশান্ত মন্ডলের স্ত্রী। মৃত্যুকালে তিনি প্রায় দুই মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তান রেখে গেছেন।
নিহতের স্বামী অশান্ত মন্ডলের অভিযোগ, গত ২৯ জুন অসুস্থ হয়ে পড়লে স্ত্রী কনিকাকে ফরিদপুর শহরের ঝিলটুলিপাড়ার সমরিতা জেনারেল হাসপাতাল লিমিটেডে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক ডা. লক্ষ্মী রানী দত্তের তত্ত্বাবধানে তাকে ভর্তি করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন কনিকা।
অশান্ত মন্ডলের ভাষ্য, অপারেশনের পরদিন থেকেই কনিকাকে অস্বাভাবিক পেট ফোলা ও তীব্র ব্যথায় ভুগতে দেখা যায়। বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো হলেও তিনি তা নানাভাবে এড়িয়ে যান বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরিস্থিতির অবনতি হলে কনিকাকে ফরিদপুর শহরের আরও কয়েকটি হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়ায় সেখানে তাকে ভর্তি করা হয়নি বলে পরিবারের দাবি।
এরপর গত ৩ জুলাই কনিকাকে রাজধানীর কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ৭ জুলাই ডা. আব্দুল জলিলের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা শুরু হয়। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা কনিকার পেটের ভেতরে সার্জিক্যাল গজ-ব্যান্ডেজ থাকার বিষয়টি শনাক্ত করেন বলে দাবি করেছে পরিবার।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিনই অস্ত্রোপচার করে কনিকার পেট থেকে সার্জিক্যাল গজ বের করা হয়। এরপর দীর্ঘদিন ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রায় ৫১ দিনের লড়াই থামিয়ে বুধবার (১৯ আগস্ট) দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কনিকা মন্ডল।
‘ভুল মানুষেরই হয়’—হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষমা চাওয়ার দাবি
অশান্ত মন্ডলের দাবি, ঘটনার পর ডা. লক্ষ্মী রানী দত্ত তাকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা পাঠিয়ে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন।
বার্তায় লেখা ছিল—
‘দাদা নমস্কার। ভালো থাকুন ঈশ্বরের কাছে সেই প্রার্থনা করি। সব কথার আগে করজোরে ক্ষমা প্রার্থী। ভুল মানুষেরই হয়…আমি ভুল করে ফেলেছি… আবারও ক্ষমা চাচ্ছি দাদা।’
নিহতের স্বামী অশান্ত মন্ডল বলেন, আমার স্ত্রীর পেটে গজ রেখে সেলাই করার কারণেই তার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হয়। দীর্ঘদিন লড়াইয়ের পর সে মারা গেল। এখন এই দুই মাসের শিশুটিকে আমি কীভাবে মা-ছাড়া বড় করব? আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।
চিকিৎসকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফরিদপুরের মুজিব সড়কে অবস্থিত সমরিতা হাসপাতালে গিয়ে ডা. লক্ষ্মী রানী দত্তকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
হাসপাতালের এক কর্মচারী জানান, প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের বাসায় গিয়ে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
পরে ঝিলটুলির টেরাকোটাসংলগ্ন ‘অচিন্ত্য টাওয়ারে’ চিকিৎসকের বাসায় গিয়েও তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে দেখা মেলেনি। বাসার দারোয়ান নাইম মোল্লা জানান, চিকিৎসক বাসায় আছেন; তবে তাকে যেন কেউ বিরক্ত না করেন, সে বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া আছে।
‘এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা নেই’ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের
সার্বিক বিষয়ে সমরিতা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মহশিন শরীফ বলেন, আমার হাসপাতালে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে জানা নেই। তবে সাংবাদিকরা ফোন করে জানিয়েছেন যে, আগে একটি ঘটনা ঘটেছিল এবং সেই রোগী মারা গেছেন।
লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্তের আশ্বাস
ঘটনাটি সম্পর্কে ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান বলেন, বিষয়টি তার জানা ছিল না; সাংবাদিকদের মাধ্যমেই তিনি প্রথম জানতে পেরেছেন।
তিনি বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, কনিকা মন্ডলের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসকের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার কারণেই দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর তার মৃত্যু হয়েছে। এখন নবজাতক শিশুটিকে ঘিরে পরিবারের সামনে তৈরি হয়েছে এক গভীর অনিশ্চয়তা। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন নিহতের স্বজনরা।
