স্বাস্থ্যখাতের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে বেরিয়ে আসছে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য। মেডিকেল টেকনিশিয়ান ও টেকনোলজিস্ট নিয়োগে অন্তত ৪০ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে এবার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরদারিতে পড়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. শামিউল ইসলাম সাদীসহ একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।
দুদকের চলমান অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নথি ও তথ্য-উপাত্তে মিলছে সুসংগঠিত নিয়োগ বাণিজ্যের আভাস। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে নির্দিষ্ট প্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে চাকরি নিশ্চিত করা হয়েছে—যা এখন তদন্তের কেন্দ্রে।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র তলব করে দুদক একাধিকবার নোটিশ দিলেও প্রথমদিকে তা আমলে নেয়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বারবার তাগিদ সত্ত্বেও নথি সরবরাহে গড়িমসি করায় প্রশ্ন ওঠে—কিছু আড়াল করার চেষ্টা কি ছিল?
পরবর্তীতে দুদক আইনের ১৯(৩) ধারার কঠোরতা উল্লেখ করে চূড়ান্ত নোটিশ পাঠানো হলে নড়েচড়ে বসেন সংশ্লিষ্টরা। শেষ পর্যন্ত নথিপত্র জমা দিতে বাধ্য হয় অধিদপ্তর। আর সেই নথি পর্যালোচনায় মিলতে শুরু করেছে অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের স্পষ্ট চিত্র।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, অনুসন্ধান এখনো চলমান। তদন্ত শেষে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। কমিশনের অনুমোদনের পরই অভিযোগসংশ্লিষ্টদের দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করা হবে।
জানা গেছে, করোনা মহামারির সময় জরুরি ভিত্তিতে ৮৮৯ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ১,৮০০ জন টেকনিশিয়ান নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার। তবে সেই মানবিক উদ্যোগকেই পুঁজি করে গড়ে ওঠে কথিত ‘নিয়োগ সিন্ডিকেট’।
বিশেষ করে ঘুষের বিনিময়ে অন্তত ১৬১ জনকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসায় ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। সহকারী পরিচালক মো. আল আমিন-এর নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম তদন্ত চালাচ্ছে।
তদন্তের অংশ হিসেবে প্রার্থীদের আবেদনপত্র, পরীক্ষার হাজিরা শিট, মূল্যায়িত খাতা, ভাইভা নম্বরপত্র, চূড়ান্ত ফলাফল ও নিয়োগপত্রসহ বিস্তারিত নথি যাচাই করা হচ্ছে। এসব নথি বিশ্লেষণে অনিয়মের নানা অসঙ্গতি উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ ঘটনায় স্বাস্থ্যখাতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহল প্রশ্ন তুলছে—জীবনরক্ষাকারী খাতেও যদি নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্য চলে, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? মেধার পরিবর্তে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ হলে স্বাস্থ্যসেবার মান কতটা ঝুঁকির মুখে পড়ে?
এখন সবার নজর দুদকের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের দিকে—এই ‘৪০ কোটি টাকার নিয়োগ কেলেঙ্কারি’ কি কেবল কিছু নামেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি উন্মোচিত হবে পুরো সিন্ডিকেটের মুখোশ?
