বান্দরবানের বালাঘাটা এলাকায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীন হর্টিকালচার সেন্টারে নির্মাণাধীন চারতলা ল্যাবরেটরি-কাম-অফিস ভবনকে ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ১৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকার এই প্রকল্পে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, তদারকির ঘাটতি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জয়েন্ট ভেঞ্চারে মেসার্স এমভি ও ইসি নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভবনটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে। তবে কাজের তদারকিতে নিয়োজিত কর্মকর্তারা নিয়মিত সরেজমিনে না গিয়ে ঢাকায় বসেই ভিডিও কলের মাধ্যমে কাজ মনিটর করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে করে নির্মাণ কাজে ঠিকাদারের ইচ্ছামতো নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। বর্তমানে টাইলস, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, স্যানিটেশনসহ বিভিন্ন কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভবনের ফ্লোর ভরাটে বালির পরিবর্তে পাহাড়ি মাটি ব্যবহারের ঘটনাও উঠে এসেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নির্মাণের শুরু থেকেই ওয়ার্ক অর্ডার অনুযায়ী নির্ধারিত মান বজায় রাখা হয়নি। পিলারে ১৫ এমএম রড ব্যবহারের কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে কম মানের রড ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া ভবনের জন্য নির্ধারিত ৪১ দিনের লোড টেস্টও যথাযথভাবে করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ভবনটি হর্টিকালচার সেন্টারের ভেতরে হওয়ায় সাধারণ মানুষের নজরের বাইরে রেখে তড়িঘড়ি করে কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। নিয়মিত ল্যাব টেস্ট ছাড়াই দ্রুত কাজ শেষ করতে গিয়ে মানের সঙ্গে আপস করা হয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বান্দরবানে পরিদর্শনে এলে তাদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই করে থাকে। এমনকি কাজের অনুকূলে প্রতিবেদন দিতে পরিদর্শন টিমকে আর্থিক সুবিধাও দেওয়া হয় বলে স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয় ঠিকাদারদের মতে, চারতলা একটি ভবন নির্মাণে ৭ থেকে ৮ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হওয়ার কথা নয়। সেখানে ১৬ কোটির বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে, যা অস্বাভাবিক এবং অতিরিক্ত। তারা মনে করেন, প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারার মাধ্যমেই এই অতিরিক্ত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে নির্মাণকাজে তদারকির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো প্রকৌশলী বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে সরেজমিনে পাওয়া যায়নি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রকৌশল বিভাগ না থাকায় একটি বেসরকারি কনস্ট্রাকশন ফার্মের মাধ্যমে কাজটি পরিচালিত হচ্ছে।
প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইরের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি অধিকাংশ সময় ঢাকায় অবস্থান করেন এবং নিয়মিত প্রকল্প এলাকায় উপস্থিত হন না। ফলে মাঠপর্যায়ে কার্যত কোনো কার্যকর তদারকি নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তালহা জুবাইর সাংবাদিকদের তার অফিসে এসে কথা বলার পরামর্শ দেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর প্রকল্পটির কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে একই কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে অন্য জেলাগুলোতেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দাপ্তরিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজনীয় তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে বলে জানা গেছে।
চলবে……
