শুক্রবার, ১৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

১৯ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে রফিকুল হাসানকে ঘিরে তোলপাড়: মেহেরপুর গণপূর্তে কি গড়ে উঠেছে অস্বচ্ছতার ‘অদৃশ্য সিন্ডিকেট’?

নিজস্ব প্রতিবেদক
জুন ১৯, ২০২৬ ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

মেহেরপুর গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল হাসানকে ঘিরে টেন্ডারবিহীনভাবে সরকারি কাজ বাস্তবায়নের অভিযোগ এখন শুধু একটি প্রশাসনিক বিতর্ক নয়; এটি পরিণত হয়েছে জেলায় বহুল আলোচিত এক প্রশ্নে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালে কি দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে একটি অস্বচ্ছ কার্যপদ্ধতি?

১৯টি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর একের পর এক বেরিয়ে আসছে নতুন তথ্য। সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় ঠিকাদার, নির্মাণসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং গণপূর্ত বিভাগের একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অভিযোগের পরিধি শুধু আড়াই কোটি টাকার কয়েকটি কাজেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়া অনুসরণের অভিযোগ রয়েছে।

টেন্ডার ব্যবস্থা কি ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল করা হয়েছে?

স্থানীয় ঠিকাদারদের দাবি, মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। সরকারি ক্রয়বিধির মূল উদ্দেশ্য হলো সর্বনিম্ন ব্যয়ে সর্বোচ্চ মানের কাজ নিশ্চিত করা এবং সকল যোগ্য ঠিকাদারের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই কাজের তথ্য গোপন রাখা, নির্বাচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে কার্যাদেশ দেওয়া এবং প্রকল্পের তথ্য প্রকাশ না করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জেলার কয়েকজন প্রবীণ ঠিকাদার জানান, একসময় গণপূর্ত বিভাগের অধিকাংশ কাজ ই-জিপি বা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হতো। ফলে কাজের গুণগত মান, ব্যয় এবং সময়সীমা নিয়ে স্বচ্ছতা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি বদলে গেছে। তাদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করছেন এবং সাধারণ ঠিকাদারদের অংশগ্রহণের সুযোগ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

ব্যয়, নকশা ও বাস্তব প্রয়োজনের মধ্যে অসঙ্গতির অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রকল্পে কাজ শুরুর আগেই সম্ভাব্য ব্যয় ও বাস্তব প্রয়োজনের মধ্যে অসঙ্গতি তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পূর্ণাঙ্গ মতামত গ্রহণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে।

কয়েকটি দপ্তরের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে তারা শুধু কাজ চলমান অবস্থায় বিষয়টি জানতে পেরেছেন। প্রকৃত ব্যয়, নকশা কিংবা অনুমোদিত পরিকল্পনা সম্পর্কে তাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না।

প্রশ্নের মুখে সাইনবোর্ড ও তথ্য প্রকাশ

অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রকল্প তদারকি। বিভিন্ন স্থানে কাজের সাইনবোর্ডে ব্যয়ের পরিমাণ, বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের নাম কিংবা কাজ শেষ হওয়ার সময়সীমা উল্লেখ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রকল্প সম্পর্কে তথ্য জানা কঠিন হয়ে পড়ছে।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের ভাষায়, সরকারি অর্থে পরিচালিত যেকোনো উন্নয়নকাজে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই সেই মৌলিক তথ্যই অনুপস্থিত।

‘জরুরি প্রয়োজন’ নাকি নিয়ম এড়ানোর কৌশল?

নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল হাসানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো ‘জরুরি প্রয়োজন’-এর যুক্তি।

তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, জরুরি প্রয়োজনের কারণেই কিছু কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, কোন প্রকল্পকে জরুরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল? সেই সিদ্ধান্তের লিখিত ভিত্তি কী? ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি?

অভিযোগকারীদের দাবি, যদি প্রকৃতপক্ষে জরুরি প্রয়োজন থেকেই কাজগুলো করা হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট অনুমোদনপত্র ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার নথি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক।

একই গোষ্ঠীর হাতে একাধিক প্রকল্প?

স্থানীয় সূত্রগুলো আরও অভিযোগ করেছে, কিছু প্রকল্পে একই ব্যক্তি বা একই গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন নামে কাজ পেয়েছে। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি, তবুও বিষয়টি নিয়ে জেলায় ব্যাপক আলোচনা চলছে।

নির্মাণ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি কাজের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা না থাকলে দুর্নীতির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রতিযোগিতাহীন পরিবেশে ব্যয় বৃদ্ধি, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার এবং জবাবদিহিতার অভাব দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে সংস্কার ও মেরামত প্রকল্পে ব্যয়ের যথার্থতা যাচাই করা তুলনামূলক কঠিন হওয়ায় সেখানে অনিয়মের সুযোগ আরও বেশি থাকে।

প্রশাসনের ভেতরেও নীরব অস্বস্তি

একাধিক কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন যে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও অনেক সময় প্রকাশ্যে মন্তব্য করা সম্ভব হয় না। কারণ একই প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে কাজ করতে গিয়ে নানা ধরনের চাপ ও জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়।

তদন্তের দাবি জোরালো

গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্ট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জানিয়েছেন, অভিযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত নন এবং অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে।

এই বক্তব্যের পর স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিষয়টি কেবল মৌখিক অনুসন্ধানে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রকল্পভিত্তিক নথি, ব্যয়, অনুমোদন ও কার্যাদেশ যাচাই করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত পরিচালিত হবে।

এখন মেহেরপুরবাসীর একটাই প্রশ্ন

অভিযোগ সত্য নাকি ভিত্তিহীন—তার উত্তর মিলবে তদন্তেই। তবে একটি বিষয় নিয়ে জেলায় প্রায় সবাই একমত, সরকারি অর্থ জনগণের অর্থ, আর সেই অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।

রফিকুল হাসানকে ঘিরে ওঠা এই অভিযোগ তাই শুধু একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; এটি সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা, উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় পর্যায়ের সুশাসন নিয়ে এক বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হলে শুধু একটি অভিযোগের নিষ্পত্তিই হবে না, বরং ভবিষ্যতে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

এসব অনিয়মের টেন্ডার আইডি সহ বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে……………

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।