বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া পৌরসভায় বাস্তবায়িত ২৭ কোটি টাকার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরুতেই বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। করতোয়া নদীর পানি শোধন করে পৌরবাসীর ঘরে ঘরে সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে নেওয়া এই মেগা প্রকল্পের আওতায় স্থাপন করা হয়েছে প্রিপেইড ওয়াটার মিটার। কিন্তু প্রকল্পের কার্যক্রম শুরুর আগেই গত ছয় মাসে পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে দুই হাজারেরও বেশি মিটার চুরির ঘটনা ঘটেছে। এতে পরীক্ষামূলকভাবে পানি সরবরাহ শুরু হলেও মিটার না থাকায় গ্রাহকদের পানির ব্যবহার নির্ধারণ ও বিলের হিসাব রাখা নিয়ে দেখা দিয়েছে জটিলতা। পরিস্থিতি সামাল দিতে শিগগিরই বিশেষ সভা আহ্বানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, উল্লাপাড়া পৌরসভার ছয় হাজার পরিবারকে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে ‘পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন’ প্রকল্পের আওতায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০২০ সালে পানি শোধনাগার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। এতে মোট ব্যয় হয়েছে ২৭ কোটি টাকা। করতোয়া নদীর পানি শোধন করে পৌরবাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পকে স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হলেও শুরুতেই প্রিপেইড মিটার চুরির ঘটনায় এর কার্যকারিতা নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের বাড়িতে স্থাপন করা মিটারগুলো চোরচক্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গত ছয় মাসে দুই হাজারের বেশি মিটার চুরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে প্রকল্পের সুফল পাওয়ার আগেই আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত সংকটে পড়েছেন গ্রাহক এবং পৌর কর্তৃপক্ষ।
ভুক্তভোগী গ্রাহক ও পৌরবাসীর অভিযোগ, মিটার রিডিং নেওয়া এবং তদারকির সুবিধার্থে অধিকাংশ প্রিপেইড মিটার বাড়ির সীমানার বাইরে স্থাপন করা হয়েছিল। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চোরচক্র একের পর এক মিটার চুরি করছে। মিটার সুরক্ষায় ব্যক্তিগত উদ্যোগ নেওয়ার পরও চুরি ঠেকানো যাচ্ছে না।
ঝিকিড়া মহল্লার প্রভাষক অলিউল ইসলাম রুবেল জানান, মিটার সুরক্ষিত রাখতে তিনি লোহার খাঁচা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু চোরেরা সেই খাঁচা ভেঙে তাঁর দুটি মিটার চুরি করে নিয়ে যায়। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন ঘোষগাঁতী এলাকার গোলাম সোলাইমান, কাওয়াকের আলী আহম্মেদ, ঝিকিড়ার তৌহিদুল ইসলামসহ আরও অনেকে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, নিজেদের উদ্যোগে মিটার পাহারা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। অন্যদিকে নতুন করে উচ্চমূল্যের মিটার কেনাও অনেক গ্রাহকের পক্ষে সম্ভব নয়। এ অবস্থায় সরকারি সহায়তায় চুরি হওয়া মিটার প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করা হলে তাঁরা উপকৃত হবেন।
উল্লাপাড়া পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, পরীক্ষামূলকভাবে পানি সরবরাহ শুরু হয়েছে। কিন্তু বিপুলসংখ্যক মিটার চুরি হয়ে যাওয়ায় কোন গ্রাহক কতটুকু পানি ব্যবহার করছেন, তা নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পানির ব্যবহার অনুযায়ী হিসাব সংরক্ষণেও জটিলতা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে এত বিপুলসংখ্যক মিটার বিনামূল্যে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। মিটার চুরির ঘটনায় উল্লাপাড়া মডেল থানায় একাধিক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও অভিযোগ করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিগগিরই পৌরসভায় বিশেষ সভা আহ্বান করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
এদিকে মিটার চুরির ঘটনায় পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। উল্লাপাড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মেহেদী হাসান সমকালকে জানান, মিটার চুরির ঘটনায় অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যে অন্তত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। পরে তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চোরচক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং চুরি যাওয়া মিটার উদ্ধারে পুলিশের একাধিক দল মাঠে কাজ করছে। অপরাধের সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
সব মিলিয়ে ২৭ কোটি টাকার গুরুত্বপূর্ণ পানি সরবরাহ প্রকল্পের শুরুতেই দুই হাজারের বেশি প্রিপেইড মিটার চুরির ঘটনা নতুন করে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দ্রুত মিটার প্রতিস্থাপন, স্থাপিত মিটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং চোরচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন পৌরবাসী।
