রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতাল। চার দিনের জীবনে থেমে গেল যমজ দুই নবজাতকের নিঃশ্বাস, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ঘিরে প্রশ্ন। ফাইল ছবি
মাত্র চার দিন আগেও ছোট্ট সংসারজুড়ে ছিল নতুন অতিথি আগমনের আনন্দ। দুই ছেলেকে নিয়ে যে পরিবার নতুন স্বপ্ন বুনছিল, সেই ঘরেই এখন নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতাল-এ মারা গেছে চার দিন বয়সী যমজ দুই নবজাতক ছেলে।
সন্তান হারিয়ে নির্বাক মা নাজমা বেগম। আর বাবা হাসান সরদারের কণ্ঠে বারবার ফিরে আসছে একটাই বাক্য—
“আজকে তো ওদের বাসায় নিয়ে আসার কথা ছিল… অথচ ফিরলাম কবর দিয়ে।
বুধবার দুপুরে স্থানীয় মসজিদের কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয় যমজ দুই শিশুকে। দাফন শেষে বাড়ি ফেরার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা। চারপাশের মানুষ শুধু শুনেছেন তার অসহায় আর্তনাদ—
“আজ তো ঘরে নেওয়ার কথা ছিল…”
রাজধানীর মাদারটেকের নন্দীপাড়া এলাকায় বসবাস করেন হাসান সরদার ও নাজমা বেগম দম্পতি। তাদের গ্রামের বাড়ি দাসপাড়া-এ। ছোট ব্যবসায়ী হাসান সরদারের সংসারে আগে থেকেই ছিল দুই ছেলে সন্তান। এবার জন্ম নিয়েছিল আরও দুই ছেলে—যমজ। পরিবারজুড়ে শুরু হয়েছিল নতুন স্বপ্নের গল্প, নতুন নাম খোঁজার ব্যস্ততা।
হাসান জানান, গত শনিবার মাগরিবের পর স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রোববার সিজারের মাধ্যমে জন্ম নেয় যমজ দুই সন্তান। অপারেশনের পর মা ও নবজাতক—দুজনই সুস্থ ছিলেন।
তিনি বলেন, তিন দিন ধরেই ডাক্তার-নার্সরা বলছিল বাচ্চাগুলো ভালো আছে। কাল রাতেও কোনো সমস্যা ছিল না।
নবজাতক দুই শিশুর নাম এখনও রাখা হয়নি। তবে পরিবারের পরিকল্পনা ছিল বড় দুই সন্তানের নামের সঙ্গে মিল রেখে তাদের নামও রাখা হবে।
কিন্তু সেই আনন্দের ঘরে হঠাৎই নেমে আসে আতঙ্ক।
হাসান সরদারের অভিযোগ, রাতের দিকে ওয়ার্ডে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে শিশু দুটির বমি শুরু হয়। তিনি দাবি করেন, পরে শুনলাম রুমের ভেতরে গ্যাসের মতো কিছু ছিল। শুধু আমার বাচ্চা না, ওই রুমে থাকা আরও কয়েকটা বাচ্চাও অসুস্থ হয়ে পড়ে।
তার অভিযোগ, শিশুদের অবস্থার অবনতি হলেও শুরুতে যথাযথ চিকিৎসা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অসুস্থ নবজাতককে নিয়ে একতলা থেকে আরেক তলায় ছোটাছুটি করতে হয়েছে পরিবারের সদস্যদের।
হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, একজন বলে পাঁচতলায় নেন, আরেকজন বলে চারতলায় নেন। অসুস্থ বাচ্চা নিয়ে আমরা শুধু দৌড়াইছি।
একপর্যায়ে যমজ দুই শিশুকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়—দুই শিশুই আর বেঁচে নেই।
ভাঙা কণ্ঠে হাসান বলেন, চার দিন ধরে আমার বাচ্চাগুলো হাসপাতালে ছিল। ডাক্তাররা যে টেস্ট দিছে, সব করাইছি। ১০ হাজার টাকার ওষুধও কিনছি। কোনো কিছুতেই না করি নাই। তারপরও আমার বাচ্চাগুলারে বাঁচাইতে পারল না…
তিনি আরও জানান, তার স্বজনেরা ওয়ার্ডে ঢুকে শ্বাসকষ্টের মতো পরিস্থিতি অনুভব করেছিলেন।
আমার বোন জামাই আর ছোট ভাই রুমে ঢুকছিল। ওরা বলছে, ভেতরে দাঁড়ানো যাচ্ছিল না। নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা ছিল।
চার দিনের ছোট্ট জীবন। পৃথিবীটাকে ঠিকমতো দেখার আগেই নিভে গেল যমজ দুই শিশুর প্রাণ। তাদের চলে যাওয়ার পর পুরো পরিবারজুড়ে এখন শুধুই কান্না, শূন্যতা আর অসহনীয় নীরবতা।
শেষবারের মতো সন্তানদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে হাসান সরদার শুধু বলছিলেন—
“যার যায়, সেই বোঝে ভাই…
