গাড়ি ফেলে পালানোর পর আবেগঘন স্বীকারোক্তি, রহস্য ঘনীভূত—একা জাহিদ, নাকি পেছনে আরও কেউ?গাড়িচালক জাহিদ হাসান। ছবি-সংগৃহীত
আমি দুঃখিত স্যার। আমাকে ভুলে যাবেন। আপনার গাড়ি লে ডি’অর কফি শপের পার্কিংয়ে রেখে গেছি। আমি আপনার প্রতি সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকব। উপরওয়ালা জানেন, আমি জীবনে কারও বিশ্বাস ভঙ্গ করিনি। তবে আমাকে এটি করতে বাধ্য করা হয়েছে। আমি জানি না, বাঁচব কি না। যদি বেঁচে থাকি আপনার টাকা ফেরত দেব। আমি এখন কাঁদছি। কারণ আমি বিশ্বাস ভঙ্গ করেছি।”
এক কোটি টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার পর মালিকের মোবাইলে গাড়িচালক জাহিদ হাসানের এমন আবেগঘন খুদে বার্তা ঘিরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কেন এমন বার্তা পাঠালেন তিনি? সত্যিই কি একাই টাকা নিয়ে পালিয়েছেন, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে অন্য কোনো রহস্য?
মঙ্গলবার তৈরি পোশাক কারখানা ল্যাভেন্ডার গ্রুপের চেয়ারম্যান এক চাইনিজ নাগরিকের মোবাইল ফোনে ইংরেজিতে ওই খুদে বার্তা পাঠান তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক জাহিদ। এর কিছুক্ষণ আগেই ব্যবসায়ীর গাড়িতে রাখা এক কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হন তিনি।
কারখানার শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার জন্য ব্যাগভর্তি করে ওই টাকা গাড়িতে রাখা হয়েছিল।
হঠাৎ গাড়ি ও চালক—দুটিই উধাও
ল্যাভেন্ডার গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) আকরামুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরের কারখানা থেকে কাজ শেষে ব্যক্তিগত গাড়িচালক জাহিদকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন চাইনিজ ব্যবসায়ী।
ঢাকা মেট্রো-চ ৫২-৫০৮৪ নম্বরের গাড়িটি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানাধীন পূর্বাচল ক্যাডেট কলেজের সামনে থামানো হয়। সেখানে একটি হোটেলে খাওয়ার জন্য যাত্রাবিরতি করেন তারা।
খাওয়া শেষে ফিরে এসে ব্যবসায়ী দেখেন—চালক নেই, গাড়িও নেই। জাহিদের মোবাইল ফোনে কল করা হলে সেটিও বন্ধ পাওয়া যায়।
এর কিছুক্ষণ পরই আসে সেই রহস্যময় খুদে বার্তা। জাহিদের ফোন থেকেই চাইনিজ ব্যবসায়ীর মোবাইলে পাঠানো হয় বার্তাটি।
গাড়ি উদ্ধার, টাকা কোথায়?
ঘটনার পর মঙ্গলবার রাতেই ল্যাভেন্ডার গ্রুপের পক্ষ থেকে প্রথমে গুলশান থানায় যোগাযোগ করা হয়। চাইনিজ ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা থানায় গিয়ে পুরো ঘটনা জানান।
পরে মঙ্গলবার রাতে গুলশানের আজাদ মসজিদের সামনে থেকে ব্যবসায়ীর গাড়িটি উদ্ধার করা হয়। তবে গাড়ি উদ্ধার হলেও এক কোটি টাকা ও চালক জাহিদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
প্রথমে গুলশান থানা থেকে জানানো হয়, ঘটনাটি সম্ভবত খিলক্ষেত থানাধীন এলাকায় ঘটেছে। এরপর ল্যাভেন্ডার গ্রুপের লোকজন খিলক্ষেত থানায় গেলে সেখান থেকে জানানো হয়, ঘটনাস্থল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানাধীন হতে পারে।
মামলায় একমাত্র আসামি চালক জাহিদ
পরদিন বুধবার ল্যাভেন্ডার গ্রুপের জিএম আকরামুল ইসলাম বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলায় একমাত্র অভিযুক্ত করা হয়েছে গাড়িচালক জাহিদ হাসানকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাহিদের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুর আন্দুলিয়া এলাকায়। প্রায় চার মাস আগে তিনি ল্যাভেন্ডার গ্রুপে চাকরি নেন। বর্তমানে রাজধানীর উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরে থাকেন তিনি।
এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে ব্যবসা
ভুক্তভোগী চাইনিজ পোশাক ব্যবসায়ী এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করে তৈরি পোশাকের ব্যবসা করছেন। দুটি কারখানার তিনি একক মালিক এবং আরও দুটি কারখানায় অংশীদার রয়েছেন। বাংলাদেশের বাইরেও তার ব্যবসা রয়েছে।
এমন একজন ব্যবসায়ীর গাড়ি থেকে শ্রমিকদের বেতনের এক কোটি টাকা নিয়ে চালকের উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বিশেষ করে টাকা নিয়ে পালানোর পর মালিকের ফোনে পাঠানো খুদে বার্তায়—আমাকে এটি করতে বাধ্য করা হয়েছে—এমন বক্তব্য থাকায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।
তাহলে কি জাহিদ একাই এ ঘটনা ঘটিয়েছেন? নাকি তাকে কেউ বাধ্য করেছে? টাকার পুরোটা কোথায় গেছে?
এখন তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
দ্রুত টাকা উদ্ধারের দাবি
চাইনিজ ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি চালক জাহিদ হাসানকে নিয়োগ দেওয়ার সময় নেওয়া প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরবরাহ করেছেন। একই সঙ্গে দ্রুত চুরি যাওয়া টাকা উদ্ধারে পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
গুলশান থানার ওসি দাউদ হোসেন বলেন, মঙ্গলবার রাতে অভিযোগ পাওয়ার পর গাড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। এরপর পরবর্তী করণীয় বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রূপগঞ্জ থানার ওসি এ এইচ এম সালাউদ্দিন বলেন, “মামলার পর তদন্ত শুরু করেছি। দ্রুত চালককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। গার্মেন্টস মালিক ওই টাকা গাজীপুরের একটি ব্যাংক থেকে তুলেছিলেন।
ছায়া তদন্তে ডিএমপি
পুলিশ সূত্র জানায়, চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার ছায়া তদন্ত শুরু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
চালক জাহিদের খুদে বার্তায় উঠে আসা ‘বাধ্য করা হয়েছে—এই দাবির সত্যতা, এক কোটি টাকার গতিপথ এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না—এসব বিষয়ই এখন তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে।
