কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের কার্যালয়। ছবি: গণমাধ্যম থেকে নেওয়া
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের পেনশন ও ভাতাদি-সংক্রান্ত বকেয়া বিল পরিশোধের প্রক্রিয়ায় ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি পেনশন ব্যবস্থাপনার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আইবাস++ ব্যবহার করে ২৬ জন পেনশনারের ৩৪৬টি বকেয়া পেনশন বিলের মাধ্যমে মোট ১৩ কোটি ৩৭ লাখ ৪১ হাজার ৮৫৬ টাকা বিধিবহির্ভূতভাবে পরিশোধ ও আত্মসাতের অভিযোগে অডিট অধিদপ্তরের দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
বরখাস্ত হওয়া দুই কর্মকর্তা হলেন ইশরাত জাহান ও শাহীনুর রহমান খান। তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্তে গুরুতর অনিয়মের দায় পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) কার্যালয় থেকে পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করে তাদের সাময়িক বরখাস্তের কথা জানানো হয়।

আইবাস++-এ ৩৪৬ বিলের কারসাজির অভিযোগ
এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সরকারি পেনশন ব্যবস্থাপনার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আইবাস++-এর মাধ্যমে প্রায় ৬ কোটি ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ৯২৮ টাকা বিধিবহির্ভূতভাবে পরিশোধের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইশরাত জাহান তার নিজস্ব আইবাস++ ইউজার আইডি ব্যবহার করে পেনশন ও ভাতাদি-সংক্রান্ত বকেয়া বিলের বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। এভাবে ২৬ জন পেনশনারের ৩৪৬টি বকেয়া পেনশন বিল বাবদ ৬ কোটি ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ৯২৮ টাকা বিধিবহির্ভূতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে আসে।
প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে ওই অর্থ বিধিবহির্ভূতভাবে পরিশোধের জন্য ইশরাত জাহানকে সম্পূর্ণভাবে দায়ী করা হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।
যেভাবে সাময়িক বরখাস্ত ইশরাত
ইশরাত জাহান বর্তমানে চিফ কন্ট্রোলার ডিফেন্স ফাইন্যান্সের আর্মি জেসিও অ্যান্ড ওআর কার্যালয়ে উপসহকারী ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার (ডিএএফসি) পদে কর্মরত। এর আগে তিনি প্রতিরক্ষা অর্থ বিভাগে (ডিফেন্স ফাইন্যান্স) একই পদে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রাথমিক তদন্তে দায়ের বিষয়টি সামনে আসার পর সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৩৯(১) ধারা অনুযায়ী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে তার সাময়িক বরখাস্ত কার্যকর হয়েছে।

বরখাস্তকালীন সময়ে তিনি বিধি অনুযায়ী খোরাকি ভাতা (সাবসিস্ট্যান্স গ্র্যান্ট) পাবেন।
একই ৩৪৬ বিলের প্রক্রিয়ায় শাহীনুরের নাম
অন্য প্রজ্ঞাপনে অডিট কর্মকর্তা শাহীনুর রহমান খান-এর বিরুদ্ধেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমানে তিনি চিফ কন্ট্রোলার ডিফেন্স ফাইন্যান্স আর্মি (সিও) কার্যালয়ে কর্মরত। এর আগে তিনি চিফ কন্ট্রোলার ডিফেন্স ফাইন্যান্স আর্মি (পেনশন ও ফান্ড) এসএএস অধীক্ষক (সুপার) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, শাহীনুর রহমান খানও আইবাস++ প্ল্যাটফর্মে নিজের ইউজার আইডি ব্যবহার করে ২৬ জন পেনশনারের বকেয়া পেনশন ও ভাতাদি পরিশোধের জন্য বকেয়া বিলের সার্টিফিকেট জেনারেশন এবং পেনশন অ্যারিয়ার বিলের টোকেন এন্ট্রি করেন।
এর মাধ্যমে ২৬ জন পেনশনারের ৩৪৬টি বকেয়া পেনশন বিল বাবদ ৬ কোটি ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ৯২৮ টাকা বিধিবহির্ভূতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।
দুজনের বিরুদ্ধে একই অর্থের অভিযোগ
দুটি পৃথক প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই ৬ কোটি ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ৯২৮ টাকা করে, অর্থাৎ মোট ১৩ কোটি ৩৭ লাখ ৪১ হাজার ৮৫৬ টাকা বিধিবহির্ভূতভাবে পরিশোধ ও আত্মসাতের অভিযোগ সামনে এসেছে।
বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে এ কারণে যে, অভিযোগের সঙ্গে জড়িত বিলগুলো একই ২৬ জন পেনশনারের ৩৪৬টি বকেয়া পেনশন বিল ঘিরে।
প্রশাসনিক ব্যবস্থা, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়
তবে প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে নেওয়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা। অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।
পরবর্তী তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনের অনুলিপি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্স, সিএজি কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ফর্মস ও প্রকাশনা অফিসসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি পরবর্তী গেজেটে প্রকাশের জন্যও অনুরোধ জানানো হয়েছে।
পেনশন ব্যবস্থাপনার মতো সংবেদনশীল একটি সরকারি আর্থিক প্রক্রিয়ায় আইবাস++ ব্যবহার করে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিধিবহির্ভূতভাবে পরিশোধের অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি এখন সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছে। পরবর্তী তদন্তে প্রকৃত দায় ও অর্থের গতিপথ কতটা স্পষ্ট হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
