স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর নারায়ণগঞ্জ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসানুজ্জামান দুলালকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ, প্রশাসনিক বিতর্ক এবং রাজনৈতিক প্রভাবের আলোচনা চলে আসছে। বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম এবং রাজনৈতিক আনুগত্য পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং সরকারি তদন্ত বা আদালতের চূড়ান্ত রায়ে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য এই প্রতিবেদনের কাছে নেই।
‘৩% দুলাল’ নামে পরিচিতির অভিযোগ
এলজিইডির ঠিকাদারদের একটি অংশের মধ্যে তিনি ‘৩% দুলাল’ নামে পরিচিত বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বিল ছাড় করতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ৩ শতাংশ কমিশন আদায় করা হতো। এ অভিযোগকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
চাকরির শুরুতেই বরখাস্ত, পরে পুনর্বহালের অভিযোগ
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাকরি জীবনের শুরুতে রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায় কর্মরত অবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগে তিনি বরখাস্ত হয়েছিলেন। পরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করিয়ে পুনরায় চাকরিতে ফিরে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ দাবির স্বতন্ত্র প্রমাণ এই প্রতিবেদনের জন্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
হাওর প্রকল্পে শত শত কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ
পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (IFAD) অর্থায়িত হাওর ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড লাইভলিহুড ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (HILIP)-এ দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী থেকে ডেপুটি প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটে।
কাজ না করেই বিল, ভুয়া এলসিএস ও প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
এলজিইডির অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রশাসনের কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ও বড় প্রকল্পের দায়িত্ব লাভ করেন। একই সময়ে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলন, ভুয়া লেবার কন্ট্রাক্টিং সোসাইটি (LCS) ব্যবহার এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
৩৩টি অভিযোগ ও দুদকের মামলা—অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলজিইডিতে তার বিরুদ্ধে ৩৩টি অভিযোগ উত্থাপিত হয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি মামলা গ্রহণ করে। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, প্রভাবশালী মহলের কারণে অভিযোগ ও মামলার কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। যদিও এ দাবির স্বাধীন যাচাই এই প্রতিবেদনের জন্য সম্ভব হয়নি।
কদম রসুল সেতু প্রকল্পে নতুন বিতর্ক
নারায়ণগঞ্জে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদানের পরও তাকে ঘিরে বিতর্ক থামেনি। কদম রসুল সেতু নির্মাণ প্রকল্পে বুয়েটের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নির্মাণসামগ্রীকে অসন্তোষজনক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা এবং পরীক্ষার ফল নিয়ে প্রশ্ন তোলার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, এ ঘটনায় প্রকল্প পরিচালক প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত তদন্তের আবেদন করেন। এতে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
শোকজ ও দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির দাবি
বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের নির্দেশে তাকে প্রকল্পের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) প্রদান করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে সেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বহাল ছিল কি না—এ বিষয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যায়।
বদলি নিয়েও বিতর্ক
২০২৬ সালে এলজিইডির নতুন বদলি নীতিমালা জারির পর নিজ জেলায় পদায়নের আদেশ পাওয়াকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক মহলে সমালোচনা শুরু হয়। পরে সেই আদেশ প্রত্যাহার করা হলে বদলি নীতিমালার স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
রাজনৈতিক অবস্থান বদলের অভিযোগ
রাজনৈতিক অঙ্গনেও তাকে নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত থাকলেও ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি দ্রুত নতুন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর চেষ্টা করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ থেকে রক্ষা পেতেই তিনি রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করেন। এমনকি সরকারি কর্মকর্তা হয়েও বিএনপির মহাসচিবের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
জবাবদিহি নিয়ে নানা প্রশ্ন
ঠিকাদার ও এলজিইডির একটি অংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে থেকে মো. আহসানুজ্জামান দুলাল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা অধিকাংশ অভিযোগ কার্যকর তদন্তের মুখ দেখেনি। ফলে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সুশাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এ কারণে এলজিইডির ঠিকাদার মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। যা পরবর্তীতে ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসানুজ্জামান দুলালের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য নির্ধারণ করা সম্ভব। অভিযোগগুলো এখনো আদালত বা সরকারি তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো তথ্য এই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি। তবে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জোরালো হচ্ছে। বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে…….
