কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ।সাবেক ডিজি আক্কাস-এনায়েত-দীপক নন্দীকে ঘিরে নানা প্রশ্ন, তদবির ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ। ফাইল ছবি
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে বদলি, পদায়ন ও সংযুক্তিকে ঘিরে অনিয়ম, তদবির এবং আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পছন্দের কর্মস্থলে বদলি কিংবা কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে পদায়ন পেতে নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি প্রভাবশালী মহলের তদবির এবং কথিত আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে—এমন অভিযোগ করেছেন অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক ও ভুক্তভোগী।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) আবুল খায়ের মো. আক্কাস আলী, সহকারী পরিচালক-০৫ মো. এনায়েত করিম এবং সহকারী পরিচালক-০৩ (পলিটেকনিক শাখা) দীপক নন্দী। তাদের ঘিরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বদলি ও পদায়নের সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছে—এমন অভিযোগও সামনে এসেছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বদলি-পদায়ন ঘিরে তদবিরের ‘খেলা’?
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের বিভিন্ন শাখায় বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের তদবির চলে আসছে। পছন্দের কর্মস্থলে বদলি, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পদায়ন কিংবা সংযুক্তির জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষকরা নানা মাধ্যমে যোগাযোগ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বাইরে প্রভাব খাটিয়ে বদলি কিংবা পদায়নের সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ ক্ষেত্রে তদবিরকারী ও মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন।
অভিযোগকারীদের দাবি, বদলি-পদায়নের মতো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যদি বিধি, যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা, শূন্যপদ ও প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনের ভিত্তিতে নেওয়া হয়, তাহলে তদবির কিংবা আর্থিক লেনদেনের সুযোগ থাকার কথা নয়। কিন্তু এসব অভিযোগ সামনে আসায় পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
ওয়েবসাইটে নিয়মিত বদলি-পদায়নের আদেশ
এদিকে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের নিজস্ব ওয়েবসাইটে চলতি আগস্ট মাসেও সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বদলি, পদায়ন এবং দায়িত্ব প্রদানের একাধিক আদেশ প্রকাশ করা হয়েছে।
সরকারি আদেশের মাধ্যমে বদলি ও পদায়ন একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হলেও এসব আদেশের পেছনে কোনো ধরনের অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার কিংবা আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অভিযোগকারীরা।
তাদের দাবি, বদলির আবেদন গ্রহণ থেকে শুরু করে সুপারিশ, নথি উপস্থাপন, অনুমোদন এবং চূড়ান্ত আদেশ জারির প্রতিটি ধাপ পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
তদবির ঠেকাতে সতর্কবার্তার পরও প্রশ্ন
বদলি নিয়ে তদবির ঠেকাতে চলতি বছরের জুনে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দেওয়ার বিষয়টিও গণমাধ্যমে আসে।
অনলাইনে আবেদনের সুযোগ থাকার পরও বদলি ও অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে তদবির করতে সশরীরে অধিদপ্তরে আসার প্রবণতা নিয়ে তখন সতর্ক করা হয়েছিল। ফলে তদবির বন্ধে অধিদপ্তরের এমন অবস্থানের পরও যদি বদলি-পদায়নকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেন কিংবা কোনো সিন্ডিকেটের প্রভাবের অভিযোগ ওঠে, তাহলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—অনলাইনে আবেদন ও নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া থাকার পরও যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বদলি-পদায়নের সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তাহলে সেই প্রভাবের উৎস কোথায়?
কার সুপারিশে বদলি, কীভাবে হচ্ছে সিদ্ধান্ত?
অভিযোগকারীদের দাবি, শুধু বদলির আদেশ প্রকাশ করলেই পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হয়ে যায় না। কোন আবেদন কীভাবে যাচাই করা হচ্ছে, কার সুপারিশে কোন কর্মকর্তা বা শিক্ষককে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হচ্ছে, একই ধরনের আবেদনের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণ কী—এসব প্রশ্নেরও জবাব প্রয়োজন।
বিশেষ করে বদলি সংক্রান্ত আবেদনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা, নথি উপস্থাপনের প্রক্রিয়া, সুপারিশের ধরন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন পর্যায় খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগকারীদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্ত ও নথিপত্র পর্যালোচনা করা হলে বদলি-পদায়নকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন কিংবা প্রভাব বিস্তারের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা স্পষ্ট হতে পারে।
নথি পর্যালোচনায় বেরিয়ে আসতে পারে ‘নেপথ্যের’ তথ্য
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, পরিচালক এনায়েত করিম, ভোকেশনাল শাখার পরিচালক মো. রেজাউল হক এবং পলিটেকনিক শাখার সহকারী পরিচালক দীপংকর নন্দীর যোগসাজশে সাবেক ডিজির ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মাহবুব-এর মাধ্যমে বদলির ফাইল ডিজি আক্কাস আলীর টেবিলে উপস্থাপন করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, পরবর্তী সময়ে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বদলির আদেশে স্বাক্ষর করানোর চেষ্টা কিংবা সুবিধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট বদলি ফাইল, নথির গতিপথ, সুপারিশ ও অনুমোদনের কাগজপত্র পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
একই সঙ্গে গত কয়েক মাসে হওয়া বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে আবেদন, সুপারিশ, অনুমোদন এবং চূড়ান্ত আদেশের নথিপত্র পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।
তদন্তের দাবি
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষকদের একটি অংশের দাবি, বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে প্রয়োজন হলে সাম্প্রতিক সময়ের বদলি আদেশগুলোর নমুনাভিত্তিক পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
তাদের ভাষ্য, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আস্থা বাড়বে। একই সঙ্গে তদবিরের সংস্কৃতি এবং কথিত আর্থিক লেনদেনের সুযোগও কমবে।
অভিযোগের জবাব মেলেনি
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের নিজস্ব ওয়েবসাইটে বদলি ও পদায়নের আদেশ প্রকাশের পাশাপাশি অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তদন্ত ও যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে।
তবে আবুল খায়ের মো. আক্কাস আলী, মো. এনায়েত করিম ও দীপকনন্দীর বিরুদ্ধে ওঠা বদলি বাণিজ্য কিংবা কথিত সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তারা ফোন কল গ্রহণ করে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাদের অবস্থান জানা সম্ভব হয়নি।
এখন প্রশ্ন—বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়া কি পুরোপুরি বিধি, যোগ্যতা ও প্রশাসনিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে, নাকি এর আড়ালে তদবির ও আর্থিক লেনদেনের কোনো অদৃশ্য পথ তৈরি হয়েছে?
অভিযোগ সত্য না মিথ্যা—তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও নথিনির্ভর যাচাই। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন নিয়ে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হলে নেপথ্যের প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
এসব অনিয়মের অভিযোগের নেপথ্যে কারা, কীভাবে বদলি-পদায়নের ফাইল এগোয় এবং অভিযোগের সঙ্গে নথিপত্রের কোনো মিল রয়েছে কি না—তা নিয়ে বিস্তারিত থাকবে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে……..
