ক্রিস্টা পাইক
নৃশংস একটি হত্যাকাণ্ডের ৩০ বছর পর ক্রিস্টা পাইক নামে এক নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির গভর্নর বিল লি। আগামীকাল বুধবার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা। যদি সেটি হয় তবে ২০০ বছরের ইতিহাসে টেনেসিতে প্রথম কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা হবে।
ক্রিস্টা পাইকের বয়স এখন ৫০ বছর। ১৮ বছর বয়সে তিনি ও তার ১৭ বছর বয়সী প্রেমিক তাডারিল শিপ মিলে সহপাঠী কলিন স্লেমোরকে হত্যা করেন। ঘটনাটি ১৯৯৫ সালের। হত্যাকাণ্ডে নৃশংসতা ও অভিযুক্তদের বয়সের কারণে মামলাটি তখন বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়।
পরের বছর আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন ক্রিস্টা পাইক। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে আধুনিক আমেরিকার ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ নারী হিসেবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের তালিকায় উঠে আসেন ক্রিস্টা। সাজা ঘোষণার পর জানা যায়, শৈশবে তিনি চরম যৌন নির্যাতন শিকার হন, ও মানসিক সংকটের মধ্যে ছিলেন।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় ঘনিয়ে এলে এসিএলইউ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলো টেনেসির গভর্নরের দপ্তরে ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড রদের জোর দাবি জানায়।
তবে গভর্নর বিল লি এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। এক বিজ্ঞপ্তিতে তিনি বলেন, ‘ক্রিস্টা গেইল পাইকের প্রাণভিক্ষার আবেদন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়েছে। মামলার সার্বিক দিক পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর টেনেসির আদালতের রায় বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং এতে হস্তক্ষেপ করার কোনো পরিকল্পনা আমার নেই।
গভর্নরের এই বিবৃতিতে হতাশা প্রকাশ করেছেন ক্রিস্টা পাইকের আইনজীবীরা। এক বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘গভর্নর লি-র এই সিদ্ধান্ত প্রমাণিত করে, ১৮ বছর বয়সী একজন ব্যক্তি, যিনি শৈশবে তীব্র ট্রমার মধ্য দিয়ে গেছেন,অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তার দায়িত্ব কতটুকু থাকে, সে সংক্রান্ত কয়েক দশকের বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে রাষ্ট্র সরাসরি উপেক্ষা করল।
আইনজীবীরা আরও জানান, ‘শৈশবে যেসব মানুষ ও প্রতিষ্ঠান তাকে ভালোবাসায় আগলে রাখার কথা ছিল, তারা ব্যর্থ হয়েছে। মানসিকভাবে অসুস্থ সেই মেয়েটির সঙ্গে আজকের ক্রিস্টা পাইকের বিশাল পার্থক্য রয়েছে। আজকের ৫০ বছর বয়সী ক্রিস্টা পাইক একজন অনুতপ্ত নারী, যিনি ভুলের মাত্রা বোঝেন। কারাগারে অন্য নারী বন্দিদের সহযোগিতা করছেন।
এই মৃত্যুদণ্ড স্থগিত চেয়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে তার আইনজীবী দল।
সহকারী ফেডারেল ডিফেন্ডার স্টিফেন ফেরেল জানান, ক্রিস্টা পাইক খুব ছোটবেলা থেকেই যৌন নির্যাতনের শিকার। ১১ ও ১৭ বছর বয়সে তিনি ধর্ষণের শিকার হন। বিচার চলাকালে তৎকালীন আইনজীবীরা তার এই ভয়াবহ অতীতের কথা জুরিদের সামনে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন।
প্রাণভিক্ষার আবেদনে স্ক্রিস্টা পাইক লেখেন, ‘আমি তখন মানসিক রোগে আক্রান্ত ছিলাম। ভুলটি উপলব্ধি করতে আমার বহু বছর লেগেছে। আমি কারও সন্তান, বোন ও বন্ধুকে হত্যা করেছি। আজ ভাবলেই আমার শরীর শিউরে ওঠে- কীভাবে আমি এমন একটি অপরাধ করতে পেরেছি।
আইনজীবী ফেরেল উল্লেখ করেন, বয়োসন্ধিকালে মস্তিষ্কের বিকাশ সম্পর্কে অনেক গবেষণা রয়েছে। অথচ ক্রিস্টা পাইকের প্রেমিক তাডারিল শিপকে বয়সের কারণে পেরোলের সুযোগসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া ঘটনায় জড়িত তৃতীয় তরুণ কেবল সহযোগিতার কথা স্বীকার করায় তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
নিহত কলিন স্লেমোরের মা মে মার্টিনেজ জানান, তার মেয়ে স্পেশাল অলিম্পিকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করত, স্কেটিং ভালোবাসত। কম্পিউটার নিয়ে কাজ করার স্বপ্ন ছিল তার।
টেনেসিতে সর্বশেষ এক নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় ১৮২০ সালে। একটি অপরাধে সহায়তার অভিযোগে মার্টিন ইভ নামের ওই নারীকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরিতে ২০২৩ সালে অ্যাম্বার ম্যাকলাফলিন নামে এক তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। এছাড়া ২০২১ সালে ফেডারেল সরকার লিসা মন্টগোমারি নামের এক নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে, যা ছিল সাত দশকের মধ্যে প্রথম। এর আগে ২০১৫ সালে জর্জিয়ায় এক নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
