গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পদায়ন ঘিরে প্রশ্ন, প্রশাসনের নীরবতায় বাড়ছে বিতর্ক। দুদকে অভিযোগ দায়ের প্রক্রিয়াধীন। ফাইল ছবি
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি চালুর পরও স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক থামছে না। বরং ক্যাটাগরি নির্ধারণে অস্বচ্ছতা, গ্রেডিং শিটে কথিত কারসাজি, পূর্বনির্ধারিত পদায়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনের অভিযোগে গণপূর্ত প্রশাসন এখন নতুন করে সমালোচনার মুখে।
অভিযোগকারীদের দাবি, লটারি পদ্ধতির আড়ালে কর্মকর্তাদের পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। ক্যাটাগরি নির্ধারণ ও পদায়নকে কেন্দ্র করে প্রায় ১২০ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। একই সঙ্গে অতীতে বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে আলোচিত কয়েকজন প্রকৌশলীকে আবারও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পদায়ন করায় অধিদপ্তরের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, সংসদ ভবন, এমপি হোস্টেল, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, এনএসআই, দুদক ও ডিজিএফআইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা, কাজের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, সততা ও বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করেই তাঁদের ‘এ প্লাস’, ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ ও ‘ডি’—এই পাঁচটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করা হয়। পরে লটারির অজুহাতে পছন্দের কর্মকর্তাদের সুবিধাজনক ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্যাটাগরি নির্ধারণের লিখিত মানদণ্ড, মূল্যায়ন পদ্ধতি, অনুমোদনসংক্রান্ত নথি কিংবা গ্রেডিং শিটের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ না করায় পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব নথি প্রকাশ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া বিতর্কের অবসান সম্ভব নয়।
অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস, আ ন ম মাজহারুল ইসলাম, মো. জিয়াউর রহমান, মাসুম বিল্লাহ, রেজা তৈমুর মালিক, রাশেদ আহসান, রাজিবুল ইসলামসহ একাধিক কর্মকর্তা। একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান (বিপ্লব), সংস্থাপন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি অংশের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
অর্ণব বিশ্বাসের বিরুদ্ধে একাধিক প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ
শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত মেডিকেল উপবিভাগে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাসের বিরুদ্ধে নিউরো সায়েন্স হাসপাতালের প্রকল্প থেকে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন প্রকৌশলীর বক্তব্যের বরাতে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, ময়মনসিংহ গণপূর্ত বিভাগে পদায়নের ক্ষেত্রেও তিনি মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছেন। সর্বশেষ ক্যাটাগরি লটারির মাধ্যমে সিলেট গণপূর্ত বিভাগে পদায়ন পেতেও বিপুল অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, নিটোর, মেন্টাল হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ও হৃদরোগ হাসপাতালের ভার্টিক্যাল এক্সটেনশন প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালে অর্ণব বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এসব ভার্টিক্যাল এক্সটেনশনের কাজের পাশাপাশি বাৎসরিক মেরামতের কাজও করা হয়েছে।
বিশেষ করে এপিপি এবং স্বাস্থ্য মেরামত খাত ১৩৮-এর বরাদ্দের পুরো অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
তাঁদের প্রশ্ন, এসব প্রকল্পের কাজ, বিল, প্রাক্কলন, কার্যাদেশ, ভেরিয়েশন এবং মেরামত খাতের অর্থ ব্যয়ের নথি পরীক্ষা না করেই তাঁকে সিলেট গণপূর্ত বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হলো কেন?
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অর্ণব বিশ্বাস বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি হল শাখার ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন এবং গণপূর্ত বিভাগের রিজার্ভে কর্মরত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি সর্বোচ্চ সুবিধাভোগীদের একজন ছিলেন বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।
তবে রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীত কর্মকাণ্ডের অভিযোগের পরিবর্তে তাঁর দায়িত্বকালীন প্রকল্পের নথি, আর্থিক লেনদেন, কাজের মান এবং সম্পদের উৎস যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন প্রকৌশলীর পুনর্বাসন চলছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ ক্ষেত্রে সংস্থাপন শাখার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ফিরোজ আলম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান (বিপ্লব) এবং নির্বাহী প্রকৌশলী আ ন ম মাজহারুল ইসলামের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
লটারির আড়ালে পূর্বনির্ধারিত পদায়নের অভিযোগ
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে গত ১৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত লটারি এবং পরবর্তী পদায়ন আদেশ ঘিরে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, একাধিক বাক্সে কর্মকর্তাদের নাম আলাদাভাবে রেখে লটারির প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। ঢাকার চার-পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগের জন্য আগেই কিছু কর্মকর্তাকে নির্ধারণ করে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গত ১৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে রেজা তৈমুর মালিককে ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে পদায়ন করা হয়।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, নির্বাহী প্রকৌশলীদের ক্যাটাগরি নির্ধারণের মানদণ্ড কী ছিল, কোন মূল্যায়নের ভিত্তিতে কর্মকর্তারা নির্বাচিত হলেন এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দায়িত্ব দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত যাচাই সম্পন্ন করা হয়েছিল কি না।
অভিযোগে নির্বাহী প্রকৌশলী আ ন ম মাজহারুল ইসলাম, মো. জিয়াউর রহমান, রেজা তৈমুর মালিক, মাসুম বিল্লাহ ও রাশেদ আহসানসহ কয়েকজনের ক্যাটাগরি নির্ধারণ এবং পদায়নপ্রক্রিয়া তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
গ্রেডিং শিটে কারসাজি, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়নের অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, লটারির আগেই গ্রেডিং শিটে পরিবর্তন এনে আ ন ম মাজহারুল ইসলাম ও মো. জিয়াউর রহমানের মতো কর্মকর্তাদের ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়নের পথ তৈরি করা হয়।
এ ঘটনায় সংস্থাপন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং নির্বাহী প্রকৌশলীদের একটি অংশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীরা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান (বিপ্লব), নির্বাহী প্রকৌশলী বিপ্লব, সংস্থাপন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাজহার এবং নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়ার ভূমিকা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
আ ন ম মাজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩, রেলওয়ে ডিভিশন ও প্রকল্প বিভাগ-৫-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তিনি ২০০০-২০০৫ শিক্ষাবর্ষে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পড়ার সময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব যোগাযোগ তাঁর পদায়নে প্রভাব ফেলেছিল কি না, তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
অন্যদিকে, মো. জিয়াউর রহমান সংস্থাপন-২-এ দায়িত্ব পালনের পর শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১-এ পদায়ন পেয়েছেন।
সংসদ ভবন ও এমপি হোস্টেলসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দায়িত্বে তাঁকে পদায়নের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, অনুমোদন এবং প্রযোজ্য বদলি নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
মাসুম বিল্লাহর ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এ পদায়ন নিয়ে বিতর্ক
সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর আত্মীয় এবং বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতা প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহকে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এ সংযুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁর যোগ্যতা ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। এ ছাড়া আমির হোসেন আমুর আত্মীয় পরিচয়ের সূত্রে তিনি নগর গণপূর্ত বিভাগে প্রথম পদায়ন পেয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২ একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্কিং ডিভিশন। এ বিভাগের অধীনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ রয়েছে।
ফলে এখানে পদায়নের ক্ষেত্রে কর্মকর্তার যোগ্যতা, চাকরির রেকর্ড, স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত যাচাইয়ের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।
এক মাসে প্রায় দেড় হাজার প্রকৌশলী বদলি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন
গণপূর্ত অধিদপ্তরে অল্প সময়ের ব্যবধানে ব্যাপক বদলি-পদায়নও নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল), ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (ইলেকট্রোমেকানিক্যাল), ২০০ জন সহকারী প্রকৌশলী, ২১৯ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবং ১২০ জন নির্বাহী প্রকৌশলীসহ প্রায় দেড় হাজার প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়েছে।
এ সময় সংসদ ভবন, এমপি হোস্টেল, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সদরদপ্তর এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে পতিত রাজনৈতিক দলের নেত্রীর সম্ভাব্য আগমন, রাজনৈতিক অর্থায়ন এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পদায়নের মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তাঁদের আশঙ্কা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের পদায়নে যথাযথ যাচাই না হলে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
এ কারণে রাজনৈতিক পরিচয়কে একমাত্র বিবেচ্য না করে প্রত্যেক কর্মকর্তার পেশাগত রেকর্ড, দায়িত্ব পালনের ইতিহাস, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিধি অনুসরণের বিষয়টি যাচাই করা জরুরি।
গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়ন, আবু নাসের চৌধুরীকে ঘিরে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ
ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরীকে ঘিরেও কমিশন ও টেন্ডার বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান মুন্সী ওরফে টিপু মুন্সির ভায়রা বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই সম্পর্কের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এ পদায়ন পেতে ১০ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দীর্ঘদিন গণপূর্ত সম্পদ বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ ছিল।
২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রাক্কলন অনুমোদন, দরপত্রের টেকনিক্যাল অনুমোদন এবং ভেরিয়েশন অনুমোদনসহ বিভিন্ন কাজে তাঁর বিরুদ্ধে মোটা অঙ্কের কমিশন দাবির অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ই-জিপি দরপত্রে ৫ শতাংশ কমিশন না দিলে তিনি টেকনিক্যাল অনুমোদন দিতেন না। যেসব ঠিকাদার কমিশন দিতেন না, তাঁদের দরপত্রের টেকনিক্যাল অনুমোদন আটকে রাখা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪ এবং ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩-এর একাধিক দরপত্রের টেকনিক্যাল অনুমোদন আবু নাসের চৌধুরীর ই-জিপি আইডিতে ঝুলে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ই-জিপি রেকর্ড, দরপত্রের মূল্যায়ন প্রতিবেদন, অনুমোদনের সময়সীমা এবং ঠিকাদারদের অভিযোগ যাচাই করলে বিষয়টির সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন তাঁরা।
বগুড়ায় ওটিএম দরপত্রে ১০ শতাংশ কমিশনের অভিযোগ
আবু নাসের চৌধুরী বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থাকাকালে এপিপির কাজ লিমিটেড টেন্ডারিং মেথড (এলটিএম)-এর পরিবর্তে ওপেন টেন্ডারিং মেথড (ওটিএম)-এ দরপত্র আহ্বানের অনুমতি দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বগুড়া গণপূর্ত বিভাগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বরাদ্দের কাজ এবং এপিপির কাজের দরপত্র ওটিএম পদ্ধতিতে আহ্বানের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ কমিশন নেওয়া হয়েছিল।
এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট দরপত্রের অনুমোদন, প্রাক্কলন, পদ্ধতি পরিবর্তনের যৌক্তিকতা, কার্যাদেশ, বিল এবং আর্থিক লেনদেনের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
অভিযোগে উল্লিখিত ওটিএম দরপত্রের আইডিগুলো হলো—Id.no.1111781, Id.no.1119316, Id.no.1113079, Id.no.1111563, Id.no.1111558, Id.no.1111559, Id.no.1111560, Id.no.1111570, Id.no.1111567, Id.no.1111569, Id.no.1111561, Id.no.1111564, Id.no.1111565, Id.no.1111566, Id.no1081546, Id.no.1100790, Id.no.1102028, Id.no.1091973, Id.no.1091974, Id.no.1091975, Id.no.1091976, Id.no.1091977, Id.no.1091978, Id.no.1091979, Id.no.1082159, Id.no.1080235, Id.no.1080236, Id.no.1069131, Id.no.1070874, Id.no.1070875, Id.no.1070876, Id.no.1071265, Id.no.1043248, Id.no.1029596, Id.no.1018159।
এসব আইডির দরপত্র-সংক্রান্ত নথি ও অনুমোদনপ্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।
রাজিবুল ইসলাম ও রাশেদ আহসানের পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজিবুল ইসলাম ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ থেকে মহাখালীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের পর আবার একই বিভাগে পদায়ন পেয়েছেন।
তাঁর পদায়নের ধারাবাহিকতা, বদলি নীতিমালা এবং একই কর্মস্থলে পুনরায় দায়িত্ব পাওয়ার প্রশাসনিক যুক্তি যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
অন্যদিকে, রাশেদ আহসান সাবেক মন্ত্রী শরিফ আহমেদের ঘনিষ্ঠ বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ময়মনসিংহে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর মিরপুর এবং বর্তমানে আজিমপুর-সংশ্লিষ্ট কর্মস্থলে তাঁর পদায়নের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব কাজ করেছে কি না, তা তদন্তের দাবি উঠেছে।
রেজা তৈমুর মালিকের পদায়ন, স্পর্শকাতর স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে রেজা তৈমুর মালিকের পদায়নকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিযোগকারীরা।
তাঁদের দাবি, এই বিভাগের আওতায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, বিভিন্ন মন্ত্রীর বাসভবন, সচিবদের বাসভবন, এনএসআই, দুদক এবং ডিজিএফআইয়ের প্রধান কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারকাজ রয়েছে।
গত ১৩ অক্টোবর ২০২৬ গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত লটারির মাধ্যমে রেজা তৈমুর মালিক ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে পদায়নের জন্য নির্বাচিত হন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে ১৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁর পদায়ন করা হয়।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, রেজা তৈমুর মালিকের পারিবারিক রাজনৈতিক পটভূমি চুয়াডাঙ্গার আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁর বাবা মো. রেজাউল হক মালিক (মুকুল) চুয়াডাঙ্গা জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। রেজাউল হক মালিক ২০২৪ সালের ১৮ জানুয়ারি মারা যান।
তিনি চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বাজারপাড়া এলাকার বাসিন্দা ছিলেন এবং আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য সেলুন জোয়াদ্দারের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, রেজা তৈমুর মালিকের বিশেষ বিসিএসে নিয়োগ এবং পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে তাঁর নিয়োগপ্রক্রিয়া বা পদায়নে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি, পরীক্ষার ফলাফল, নিয়োগসংক্রান্ত নথি এবং পদায়নের প্রশাসনিক রেকর্ড পরীক্ষা করা জরুরি।
নিম্নমানের কোম্পানিকে পিডব্লিউডি সিডিউলে অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ
রেজা তৈমুর মালিকের বিরুদ্ধে নিম্নমানের একটি কোম্পানিকে পিডব্লিউডি সিডিউলে অন্তর্ভুক্ত করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করেছেন একাধিক সূত্র বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, স্পর্শকাতর স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার আগে তাঁর দায়িত্ব পালনের রেকর্ড, কাজের মান, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং প্রযোজ্য নিরাপত্তা যাচাই যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না।
২০১৬ সালের ছবি ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৬ সালে ইউনেসকো কর্তৃক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ স্বীকৃতি পাওয়ার পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের জনসভায় সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ আহসান, সুব্রত বিশ্বাস এবং রেজা তৈমুর মালিক অংশ নিয়েছিলেন।
তাঁরা এ-সংক্রান্ত ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন বলেও অভিযোগকারীদের দাবি। তাঁদের বিরুদ্ধে ওই সময় অন্য কর্মকর্তাদের ভয় দেখানো এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এই তিন কর্মকর্তা আবারও ঢাকায় পদায়ন পেয়েছেন। তাঁদের পদায়নের বৈধতা, দায়িত্ব পালনের রেকর্ড এবং প্রযোজ্য বিধি অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নথিভিত্তিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এদিকে, এর আগে উপসহকারী প্রকৌশলী নিমিতোশ ওজাকে ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের আওতায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে পদায়ন করা হলে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরে তাঁকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে বদলি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগকারীরা এ ঘটনাকে সামনে রেখে রেজা তৈমুর মালিকের পদায়ন আদেশ পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
লটারিতে বৈষম্য, প্রায় ১২০ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ
লটারি পদ্ধতির নিরপেক্ষতা নিয়েও একাধিক প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, পূর্তভবন-সংশ্লিষ্ট পদে শামসুন্নাহার ঝুমার নাম লটারিতে উঠলেও একই পর্যায়ের অন্য কর্মকর্তাদের নাম কেন বাদ পড়েছে, তার ব্যাখ্যা নেই।
লিবনী জামানকে হবিগঞ্জে পদায়ন করা হলেও একই পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার নাম লটারিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
একই পদমর্যাদার অর্ধশত কর্মকর্তা বহাল থাকা সত্ত্বেও কারা লটারির আওতায় এসেছেন এবং কারা বাদ পড়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
লটারি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন), তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) এবং নির্বাহী প্রকৌশলীদের একটি অংশের কথিত সিন্ডিকেট প্রায় ১২০ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, সম্পদ বিবরণী, সম্পদ কেনার অর্থের উৎস এবং নিকটাত্মীয়দের নামে অর্জিত সম্পদের তথ্য তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
তাঁদের মতে, লটারির প্রক্রিয়া প্রকৃত অর্থে স্বচ্ছ ছিল কি না, তা নির্ধারণের জন্য শুধু চূড়ান্ত পদায়ন আদেশ নয়; বরং ক্যাটাগরি নির্ধারণের নীতিমালা, গ্রেডিং শিটের মূল কপি ও সংশোধিত সংস্করণ, মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী, লটারিতে ব্যবহৃত বাক্স ও নামের তালিকা, অনুমোদনসংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
সুশাসন বিশেষজ্ঞের উদ্বেগ, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পদায়নে সতর্কতা জরুরি
গণপূর্তের ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলোতে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির বাসভবন, ডিজিএফআই প্রধানের বাসভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের বাসভবন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব দায়িত্বে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত পরিচয়ের অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের নিয়োগ বা পদায়নের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই না হলে তা সরকারের জন্য মঙ্গলজনক হবে না; বরং পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
তিনি সরকারকে বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি এসব কর্মকর্তাকে যাঁরা পদায়ন করছেন, তাঁদের ভূমিকা খতিয়ে দেখে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, আওয়ামী লীগ যদি দেশে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিতে সক্ষম হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিতে পারে। তাই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে রাজনৈতিক বিতর্কমুক্ত ও বিশ্বস্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
তবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অভিযোগ থাকলে তা যাচাইযোগ্য তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত।
মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের কাছে অভিযোগকারীদের দাবি—গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক বদলি-পদায়ন, ক্যাটাগরি নির্ধারণ, গ্রেডিং শিট প্রস্তুত এবং লটারি পরিচালনার পুরো প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক।
তাঁদের প্রস্তাব, তদন্তের স্বার্থে নিচের নথিগুলো সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা প্রয়োজন:
১. নির্বাহী প্রকৌশলীদের পাঁচটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করার লিখিত নীতিমালা, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও অনুমোদনসংক্রান্ত নথি।
২. কর্মকর্তাদের মূল গ্রেডিং শিট, সংশোধিত গ্রেডিং শিট, সংশোধনের সময়, সংশোধনকারী কর্মকর্তা এবং অনুমোদনকারীর তথ্য।
৩. ১৩ অক্টোবর ২০২৬ অনুষ্ঠিত লটারির কার্যবিবরণী, উপস্থিত কর্মকর্তাদের তালিকা, ব্যবহৃত বাক্স, নামের তালিকা এবং পুরো প্রক্রিয়ার অডিটযোগ্য রেকর্ড।
৪. ১৫ অক্টোবর ২০২৬-এর পদায়ন প্রজ্ঞাপনসহ সংশ্লিষ্ট সব বদলি ও পদায়ন আদেশের প্রশাসনিক ভিত্তি।
৫. অর্ণব বিশ্বাসের বিরুদ্ধে উত্থাপিত নিউরো সায়েন্স হাসপাতাল, নিটোর, মেন্টাল হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ও হৃদরোগ হাসপাতালের প্রকল্প এবং এপিপি ও স্বাস্থ্য মেরামত খাত ১৩৮-এর কাজের বিল, প্রাক্কলন, কার্যাদেশ ও ব্যয়ের নথি।
৬. আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত কমিশন বাণিজ্য এবং বগুড়া গণপূর্ত বিভাগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ওটিএম দরপত্রসংক্রান্ত অভিযোগ যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট ই-জিপি রেকর্ড, অনুমোদনপত্র, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন ও আর্থিক নথি।
৭. ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২, সংসদ ভবন, এমপি হোস্টেল, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, এনএসআই, দুদক এবং ডিজিএফআই-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পদায়নের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিধি অনুসরণের রেকর্ড।
৮. কথিত ১২০ কোটি টাকা অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ যাচাইয়ে আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি, আয়কর বিবরণী, সম্পদ বিবরণী এবং সম্পদের উৎস পরীক্ষা।
৯. যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের বক্তব্য গ্রহণ এবং অভিযোগকারীদের কাছে থাকা নথি ও তথ্যের সত্যতা যাচাই।
জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে প্রশ্ন আরও বাড়বে
গণপূর্ত অধিদপ্তর রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণ, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে। ফলে এ প্রতিষ্ঠানের বদলি-পদায়নে স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহি এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্ণব বিশ্বাসের বিরুদ্ধে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ, আবু নাসের চৌধুরীকে ঘিরে কমিশন বাণিজ্যের দাবি, রেজা তৈমুর মালিকের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন এবং লটারি প্রক্রিয়ায় প্রায় ১২০ কোটি টাকা অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ—সবকিছুই নথিভিত্তিক তদন্তের দাবি রাখে।
অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং সরকারি অর্থের সুরক্ষা, প্রকল্প বাস্তবায়নের মান এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুতর বিষয়। আর অভিযোগগুলো অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও দাপ্তরিক নথির মাধ্যমে তা পরিষ্কার করা জরুরি।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের কাছে এখন মূল প্রশ্ন—লটারি পদ্ধতি কি সত্যিই স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ছিল, নাকি এর আড়ালে প্রভাবশালী মহলের পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে?
গণপূর্ত প্রশাসনের নীরবতা ও বিতর্কিত পদায়ন নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব এখন দাপ্তরিক নথি, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃশ্যমান জবাবদিহির মাধ্যমেই দিতে হবে। অন্যথায় লটারি পদ্ধতির স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক আরও গভীর হবে, আর সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থার সংকটও বাড়তে থাকবে।
বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে……..
