শুক্রবার, ২৪শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ঘুষ-দুর্নীতির টাকায় শতকোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ, কাস্টমস কর্মকর্তা তুহিনকে ঘিরে বিস্ফোরক অনুসন্ধান

নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই ২৪, ২০২৬ ৬:২২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা তুহিন। বর্তমানে তিনি রংপুর ভ্যাট কমিশনারেটে কর্মরত। তবে ২০১৪ সালে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগদান করা এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাত্র এক যুগেরও কম সময়ে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে।

দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ঘুষ, দুর্নীতি, মাসোহারা বাণিজ্য, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা অভিযোগ। বিভিন্ন কর্মস্থলের একাধিক সূত্র, স্থানীয়দের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাকরির শুরু থেকেই তুহিনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে থাকে।

যশোর থেকেই শুরু অভিযোগের পথচলা

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৪ সালে কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের পর প্রথম কর্মস্থল ছিল যশোর ভ্যাট কমিশনারেট। সেখানে প্রায় দুই বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

স্থানীয় একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, যশোরে থাকাকালীন সময়েই অবৈধ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে তার সম্পদ বৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি হয়।

৪০ লাখ টাকা খরচ করে বন্ড কমিশনারেটে পদায়নের অভিযোগ

২০১৬ সালে অবিভক্ত ঢাকা বন্ড কমিশনারেটে (বর্তমান দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট) তার পদায়ন হয়। অনুসন্ধানে অভিযোগ পাওয়া গেছে, ওই পদায়ন পেতে তিনি প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয় করেন।

এরপর থেকেই তার বিরুদ্ধে ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্য, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে অনিয়মের কারণে কমিশনার তাকে ছয় মাসের জন্য সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করেন।

তৎকালীন সময়ে তিনি কমিশনারকে হুমকি দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি সে সময় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান পর্যন্ত গড়িয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। পরে চাকরিতে ফিরে এসেও তিনি আগের ধারা অব্যাহত রাখেন এবং বিভিন্ন ফাইল আটকে রেখে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ আরও জোরালো হয়।

বন্ডে থাকতেই কোটি কোটি টাকার সম্পদ

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে ২০১৭ সালে রাজধানীর রামপুরায় প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনেন তুহিন।

একই সময়ে নিজ গ্রামের বাড়ির জন্য প্রায় ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে জমিসহ বাড়ি কেনার অভিযোগ রয়েছে, যা তার মেজ ভাইয়ের নামে করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

এছাড়া গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার বারহাট্টায় একটি পার্ক নির্মাণ, প্রায় ২০ বিঘা জমি ক্রয় এবং বিভিন্ন নামে-বেনামে সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও উঠে এসেছে। অনুসন্ধান বলছে, শুধু বন্ড কমিশনারেটে কর্মরত থাকাকালীন সময়েই তিনি প্রায় ৫০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তামাবিলে ঘুষ বাণিজ্য ও মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ

বন্ড কমিশনারেটের পর তার বদলি হয় সিলেটের তামাবিল শুল্ক স্টেশনে।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, সেখানে ট্রাকপ্রতি ৫০ হাজার টাকা করে ঘুষ নেওয়া হতো এবং প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অবৈধ আয় করতেন তিনি।

অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ এসেছে, ওই সময় তিনি মাদক ব্যবসার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন। বিজিবির হাতে মদসহ আটক হওয়ার ঘটনাও ঘটে বলে দাবি করা হয়েছে। সে সময় বিজিবি সংবাদ সম্মেলন করে এবং বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে তার ছবি ও সংবাদ প্রকাশিত হয় বলেও অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরবর্তীতে তিনি প্রভাব খাটিয়ে বিষয়টি থেকে রেহাই পান বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া সিলেটে দায়িত্ব পালনকালে ঘুষের টাকার ৪০ লাখ টাকা গ্রামের এক মুদি দোকানির ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করার অভিযোগও উঠেছে। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে ওই ব্যক্তিকে অর্থ দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ

পরবর্তী সময়ে তার পদায়ন হয় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে।

সেখানে কর্মরত একাধিক সিএন্ডএফ ব্যবসায়ীর দাবি, দুই বছরে তিনি অন্তত ৪০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বন্দরে কোন পণ্য কখন খালাস হবে তা নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এছাড়া কমিশনারের নাম ব্যবহার করে পণ্য আটকে রেখে ঘুষ আদায়, নিজের লোকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন এবং বিভিন্ন ফাইল নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

শিক্ষক পরিবার, অথচ সম্পদের পাহাড়। নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার বারোঘর গ্রামে তুহিনের বাড়ি। তার বাবা মৃত চন্দন চৌধুরী ছিলেন একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং মা নিলিমা দেবনাথ ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

পরিবারের বড় ভাই ও বড় বোনও প্রধান শিক্ষক। মেজ ভাই সরকারি কলেজের শিক্ষক।

স্থানীয়দের দাবি, শিক্ষক পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে বর্তমানে বিপুল পরিমাণ জমি, বাড়ি, ব্যাংকে ডিপিএস ও এফডিআর রয়েছে। পরিবারের প্রত্যেকের নামে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব সম্পদের উৎস নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যেও নানা প্রশ্ন রয়েছে।

ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও অভিযোগ

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ২০১২ সালে প্রথম বিয়ে করার পরও চাকরির সুবিধার জন্য সেই তথ্য গোপন করার অভিযোগ রয়েছে তুহিনের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক বহাল রেখেই তিনি পরবর্তীতে এক বিবাহিত নারীকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন।

বর্তমানে রাজধানীর গুলশানে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছেন বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে কর্মরত থাকাকালীন সময়েই ওই ফ্ল্যাট কেনা হয়।

অভিযোগের বিষয়ে যা বললেন তুহিন

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে কাস্টমস ও ভ্যাট কর্মকর্তা তুহিন বলেন, কাস্টমস ও ভ্যাটের কম-বেশি সবারই অবৈধ সম্পদ রয়েছে। কারও কম, কারও বেশি।

এত সম্পদের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনাকে কি উত্তর দিতে হবে? দুদক আছে, আরও সংস্থা আছে, তারা দেখবে। আপনি দেখার কে?

এরপর তিনি উত্তেজিত হয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবির ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত হবে।

উল্লেখ্য যে, একজন রাষ্ট্রের চাকর গণমাধ্যম কে হুমকির ভাষায় কথা বলা মানে নিজের যোগ্যতাকে খাটো করা। ইতোপূর্বে ছাগল কান্ডের মতিউর এর বক্তব্য নিতে গেলে উত্তেজিত হয়ে পড়ে। পরে গণমাধ্যমে নিউজ প্রকাশিত হলে দেশত্যাগ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। আবার সহিদুল এর ৫৪ ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পদের তথ্য চাওয়া হলে উত্তেজিত হন।পরে দেশত্যাগ করে।

এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে……..

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।