মঙ্গলবার, ২১শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চাঁদার দাবিতে আতঙ্কের সেই বিকেল যেন এক দুঃস্বপ্ন—যেখানে বাস্তবতা আর ভয়ের রেখা মিশে গিয়েছিল একই বিন্দুতে

স্টাফ রিপোর্টার
এপ্রিল ২১, ২০২৬ ৪:১৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

পোশাক কারখানায় চাঁদার দাবিতে গুলির সেই বিকেল—একটি সাধারণ কর্মদিবস কীভাবে মুহূর্তেই রক্তশীতল আতঙ্কে পরিণত হতে পারে, তারই এক নির্মম উদাহরণ হয়ে উঠেছে মিরপুরের এই ঘটনা।

গার্মেন্টস মালিক কামরুল ইসলামের দিনটা শুরু হয়েছিল অন্য দিনের মতোই। বাইশটেকির কারখানায় তখন ১১৫ জন শ্রমিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত—মেশিনের শব্দে ভরা এক স্বাভাবিক শিল্পচিত্র। কিন্তু সেই ছন্দ ভেঙে দেয় একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসীর হঠাৎ আগমন। ১২-১৩ জনের দলটি প্রবেশ করেই যেন ভয়কে অস্ত্র বানিয়ে পুরো পরিবেশ দখল করে নেয়। বাধা দিতে গেলে এক কর্মকর্তাকে মারধর—আর বাকিদের উদ্দেশে খোলা হুমকি—সবাই নিস্তব্ধ।

তারপর শুরু হয় সবচেয়ে ভয়ংকর অধ্যায়।
দুজন সরাসরি ঢুকে পড়ে কামরুলের অফিস কক্ষে। টেবিলের ওপর রাখা হয় দুটি পিস্তল—যেন কথার আগেই ঘোষণা করা এক নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত। দাবি করা হয় এক কোটি টাকা চাঁদা। তিন দিনের সময়সীমা—এরপর মৃত্যু।
সময় যেন থেমে যায়।

হঠাৎ করেই একজন পিস্তল তুলে গুলি ছোঁড়ে—গুলিটি কামরুলের কানের পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে যায়। জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর সেই ক্ষণিক স্পর্শ তাকে স্তব্ধ করে দেয়। পেছনের কাচ ভেঙে হার্ডবোর্ড ভেদ করে দেয়ালে গিয়ে লাগে গুলি—কিন্তু তার শব্দ আটকে থাকে না, ছড়িয়ে পড়ে পুরো কারখানাজুড়ে।

এরপর আরেকটি ফাঁকা গুলি—আর সেই ভয়ংকর সংলাপ। আজ কানের পাশ দিয়ে গেছে… তিন দিন পর সরাসরি শরীরে ঢুকবে।

এই সময় আরও দুজন সহযোগী ঢুকে তাকে ঘিরে ফেলে। পুরো ঘটনাটি চলে মাত্র তিন মিনিট—কিন্তু সেই তিন মিনিট যেন সময়ের সবচেয়ে দীর্ঘ, ভারী ও শ্বাসরুদ্ধকর অধ্যায়।

সন্ত্রাসীরা সিসি ক্যামেরা দেখতে পেয়ে দ্রুত ভাঙচুর চালায়। শুধু ক্যামেরা নয়—অফিসের লকার ভেঙে তছনছ করে, ডিভিআর ও হার্ডডিস্ক খুলে নিয়ে যায়। প্রমাণ মুছে ফেলতে তাদের এই মরিয়া চেষ্টা যেন অপরাধের পেশাদারিত্বকেই প্রকাশ করে। তবুও বিদায়ের আগে রেখে যায় কিছু নাম—লিটন, টিটু, রাজন—যেন ভয়ও কখনও নিজের পরিচয় লুকোয় না।

ঘটনার পরই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে শ্রমিকদের মধ্যে। অনেকেই কাজ বন্ধ করে দেয়, কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ে। একটি কারখানার ভেতরে নিরাপত্তার যে ন্যূনতম অনুভূতি থাকা দরকার, সেটি মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে।
রাতেই কাফরুল থানায় মামলা করেন কামরুল ইসলাম। এরপর দ্রুত নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। র‌্যাব-৪ ছায়াতদন্ত শুরু করে এবং রবিবার রাতেই মিরপুরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করে—রানা (৩১), সাগর শেখ (২৮), কালু (২৮) ও শশী (২২)।

পরদিন র‌্যাব-৪ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই পুরো ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী রানা। ঘটনার আগে সে নিজেই গার্মেন্টসে গিয়ে আশপাশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। তার ধারণা ছিল—অস্ত্রের ভয় দেখালেই কোটি টাকা আদায় সম্ভব। আর সেই পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করতে সে সহযোগীদের নিয়ে এই দুঃসাহসিক হামলা চালায়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরেই মিরপুর ও কাফরুল এলাকাজুড়ে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারের সঙ্গে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে—যা এই ঘটনার পেছনে একটি বড় অপরাধচক্রের ইঙ্গিত দেয়।

র‌্যাব-৪-এর কোম্পানি কমান্ডার কে এন রায় নিয়তি জানিয়েছেন, এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে কাফরুল থানার ওসি সাজ্জাদ হোসেন জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার আসামিদের আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ড আবেদন করা হবে, যাতে এই চক্রের আরও তথ্য বের করা যায়।

এই ঘটনার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত? একটি কারখানায় দিনের আলোয় ঢুকে, শ্রমিকদের সামনে অস্ত্র উঁচিয়ে, মালিককে গুলি করে চাঁদা দাবি—এ যেন কেবল একটি ঘটনা নয়, বরং গভীরতর এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

আর কামরুল ইসলাম? তিনি বেঁচে আছেন—কিন্তু তার কানের পাশ দিয়ে ছুটে যাওয়া সেই গুলির শব্দ এখনও যেন প্রতিধ্বনিত হয় তার ভেতরে। প্রতিটি নিঃশ্বাসে মিশে থাকে সেই তিন মিনিটের আতঙ্ক, সেই অমোচনীয় স্মৃতি—যেখানে জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি অনুভব করেছিলেন অস্তিত্বের সবচেয়ে ভঙ্গুর সত্য।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।