রাজধানী ঢাকার পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা রাজউক (রাজউক) এখন নিজেই নানা দুর্নীতির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ। সংস্থাটির জোন-৬ ঘিরে উঠেছে গুরুতর অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ—যেখানে উচ্ছেদ অভিযানকেই ব্যবহার করা হচ্ছে অবৈধ আয়ের ‘নিয়ন্ত্রিত খাত’ হিসেবে।
উচ্ছেদের নামে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়- অভিযোগ রয়েছে, রাজউকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা অনুমোদনবিহীন বা নকশা বহির্ভূত স্থাপনার বিরুদ্ধে উচ্ছেদ নোটিশকে ‘চাপ সৃষ্টি’র হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। ভবন মালিকদের ভয় দেখিয়ে আদায় করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। অভিযোগ অনুযায়ী, অর্থ প্রদান না করলে দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়, আর অর্থ দিলে রহস্যজনকভাবে অভিযান স্থগিত বা দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে।
বেছে বেছে অভিযান- প্রভাবশালীদের জন্য নরম নীতি
উচ্ছেদ কার্যক্রমে বৈষম্যের অভিযোগও স্পষ্ট। সাধারণ নাগরিকদের ছোটখাটো অনিয়মে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলেও প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিকভাবে সংযুক্তদের ক্ষেত্রে দেখা যায় নমনীয়তা। এতে করে আইনের সমতা ও সংস্থাটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
নকশা অনুমোদনে ‘ঘুষের রেট কার্ড- অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নকশা অনুমোদন ও পরিদর্শনের ক্ষেত্রে ঘুষ যেন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ ছাড়া ফাইল অগ্রসর হয় না অনেক ক্ষেত্রে।
সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ-রাজউকের কিছু কর্মকর্তা উচ্ছেদ অভিযান ও নকশা অনুমোদনের ক্ষমতা ব্যবহার করে বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সীমিত বেতনের চাকরি সত্ত্বেও তাদের বিলাসবহুল জীবনযাপন নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জোন-৬ ঘিরে নির্দিষ্ট অভিযোগ- জোন-৬ এর একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরাসরি দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন পরিচালক (জোন-৬) মো. শওকত আলী, উপ-পরিচালক দিদারুল আলম, অথরাইজড অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুন ও জান্নাতুল মাওয়া, সহকারী অথরাইজড অফিসার তন্ময় দেবনাথ। আরও কয়েকজন ইমারত পরিদর্শকের তালিকায় রয়েছে আমিনুল ইসলাম পিয়াল, সুমন আহমেদ, ফিরোজ মিয়া।
তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ—
উচ্ছেদ অভিযানকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়া, ঘুষ গ্রহণ,
প্রভাবশালীদের রক্ষা, সাধারণ মানুষকে হয়রানি, মিটার জব্দ ও ফেরত নিয়ে বিতর্ক।
এদিকে উচ্ছেদ অভিযানের অংশ হিসেবে জব্দ করা বিদ্যুৎ মিটার ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও ঘুষের বিনিময়ে ২.৫ কাঠা জমির ওপর আটতলা ভবন নির্মাণ। ওই ভবনের তিনটি ফ্লোর বানিজ্যিক রূপে ব্যবহার করা। অথরাইজড অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, মিটার জব্দের পর চেয়ারম্যানের মাধ্যমে ফেরত দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘদিন মিটার আটকে রাখা ও ঘুষের বিনিময়ে ফেরত দেওয়ার অভিযোগে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
আদালতের নির্দেশনা, বাস্তবে প্রশ্ন- সম্প্রতি ঢাকার আদালত রাজউকের অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে কঠোর নির্দেশনা দিলেও মাঠপর্যায়ে এর কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কাগজে-কলমে উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে দুর্নীতির চক্র সক্রিয়ই রয়ে গেছে।
এদিকে মিটার জব্দের পরে ঘুষের বিনিময়ে মৌখিকভাবে নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাওয়ার একাধিক অভিযোগ রয়েছে। জনস্বার্থে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোন প্রতিকার মেলে না। তাদের দুর্নীতির আরও থাকছে পরবর্তী সংখ্যায়।
উল্লেখ্য যে, পরিকল্পিত নগরায়নের দায়িত্বে থাকা একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং সুশাসনের জন্যও হুমকি। অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
