আন্দামান সাগরের ঢেউ শুধু ট্রলার ডুবায় না—ডুবিয়ে দেয় অসংখ্য স্বপ্ন, ভালোবাসা আর অপেক্ষার প্রদীপ। দালাল চক্র ছবি: সংগৃহীত
আন্দামান সাগরের উত্তাল ঢেউ যেন আবারও লিখে দিল এক নির্মম সত্য—এই পথে যাত্রা মানেই অনিশ্চিত মৃত্যু, অথচ সেই মৃত্যুর টিকিটই বিক্রি করছে একদল নিষ্ঠুর মানুষ। মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবির মর্মান্তিক ঘটনার পর টেকনাফ উপকূলজুড়ে আবারও আলোচনায় এসেছে মানব পাচারের অন্ধকার জগৎ, যেখানে মানুষ শুধু মানুষ নয়—একটি ‘পণ্য’।
২০১৫ সালে মালয়েশিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্তের জঙ্গলে বাংলাদেশিদের গণকবর আবিষ্কারের যে শিউরে ওঠা স্মৃতি, তা যেন আবারও জীবন্ত হয়ে উঠছে। শাহপরীর দ্বীপ, সাবরাং, বাহারছড়া—এই নামগুলো এখন আর শুধু ভূগোল নয়, বরং একেকটি বেদনাময় কাহিনির সাক্ষী।
গ্রামের সরল, অভাবী মানুষদের কাছে বিদেশ মানে স্বপ্ন, মানে ভালোবাসার মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। আর সেই স্বপ্নকেই পুঁজি করে দালালরা গড়ে তুলেছে এক নির্মম বাণিজ্য। “উচ্চ আয়, নিরাপদ যাত্রা—এই মিথ্যা প্রতিশ্রুতির আড়ালে তারা ঠেলে দেয় মানুষকে মৃত্যুর মুখে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ‘টপটেন’ নামে পরিচিত একটি প্রভাবশালী দালালচক্র দীর্ঘদিন ধরে এই নৃশংস ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের রয়েছে শতাধিক মাঠকর্মী—যারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে খুঁজে বেড়ায় হতাশা, অভাব আর অসহায়ত্বে ডুবে থাকা মানুষদের। কিন্তু এই গল্প শুধু প্রতারণার নয়—এ গল্প ভালোবাসারও, অপেক্ষারও।
শাহপরীর দ্বীপের এক মা, মমতাজ বেগম—তার কণ্ঠে আজও কাঁপন। তার মেয়ে রোকসানা আক্তারকে বাজারে নেওয়ার কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তারপর একদিন দূরদেশ থেকে ফোন— ৫ লাখ টাকা না দিলে মেয়েকে আর পাবেন না। অসহায় মা তখন শুধু কেঁদেছেন— টাকা নেই, কিন্তু মায়ের বুকভরা ভালোবাসা কি কখনো কম হয়? আজও তিনি অপেক্ষা করছেন… হয়তো একদিন দরজায় কড়া নাড়বে তার মেয়ে।
এই অন্ধকার জগতের গল্পে শুধু প্রতারণা নয়, আছে বিশ্বাসঘাতকতাও। বন্ধু, প্রতিবেশী, এমনকি আত্মীয়ের ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকে দালালরা। মানুষকে ‘বেচে’ তারা হয় লাখোপতি—আর পেছনে ফেলে যায় ভাঙা পরিবার, নিঃস্ব মা-বাবা, আর অশ্রুসিক্ত ভালোবাসা।
এক স্কুলছাত্র—স্বপ্ন ছিল পরিবারের হাল ধরবে।
তাকেও নেওয়া হয়েছিল “বিদেশ পাঠানোর” নামে।
শেষ খবর—ট্রলারডুবির তালিকায় তার নাম।
স্বপ্নের জায়গায় এখন শুধু শূন্যতা। মানব পাচার শুধু অপরাধ নয়—এ যেন এক নীরব যুদ্ধ, যেখানে প্রতিদিন হারছে সাধারণ মানুষ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালালেও এই চক্রের শিকড় এত গভীরে যে সহজে উপড়ে ফেলা যাচ্ছে না।
কেউ কেউ দায় স্বীকার করে, আবার কেউ অস্বীকার করে—কিন্তু সত্যটা একটাই: এই ব্যবসা এখনও চলছে, এবং প্রতিটি নতুন যাত্রা মানে নতুন এক ঝুঁকি, নতুন এক সম্ভাব্য মৃত্যু।
উল্লেখ্য ক্ষুধা মানুষকে দুর্বল করে, স্বপ্ন তাকে অন্ধ করে—আর সেই অন্ধত্বের সুযোগ নিয়েই জন্ম নেয় এই নিষ্ঠুর বাণিজ্য। সমুদ্রের ঢেউ থেমে যায় একসময়, কিন্তু মায়ের চোখের পানি—সেটা থামে না কখনোই…।
