দেশের ই-কমার্স খাত যেন এক অদৃশ্য দোলাচলে দুলছে—বিশ্বাস আর প্রতারণার মাঝখানে। একের পর এক কেলেঙ্কারির ক্ষত এখনো শুকোয়নি, ঠিক সেই মুহূর্তেই ভেসে উঠছে নতুন আশঙ্কার ছায়া। গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে—আবারও ফিরে আসতে পারে ‘বাইক স্ক্যাম’-এর সেই পুরনো, কিন্তু ভয়ংকর চক্র।
বিভিন্ন সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগে উঠে এসেছে এক পরিচিত নাম—এসকে ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী আল মামুন, যিনি অনেকের কাছে “বাজাজ মামুন” হিসেবেই পরিচিত। অভিযোগ বলছে, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের চকচকে পর্দার আড়ালে তিনি আবারও মোটরসাইকেল বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ সংগ্রহের নতুন ফাঁদ বুনতে পারেন।
পুরনো ছকের পুনর্জাগরণ, নতুন আশঙ্কার আবহ-
একসময় ই-ভ্যালি, আলেশা মার্ট, কিউকম—এই নামগুলো ছিল স্বপ্নের মতো, আবার কারও কাছে দুঃস্বপ্নের প্রতীক। বাইক সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সময়মতো পণ্য না পেয়ে অনেকেই হারিয়েছেন সঞ্চয়, ভেঙেছে বিশ্বাস।
এখন আশঙ্কা—ঠিক সেই পুরনো ছকই হয়তো নতুন নামে, নতুন ওয়েবসাইটে, নতুন প্রতিশ্রুতির মোড়কে আবার ফিরে আসছে। যেখানে অর্ডার নেওয়া হবে, কিন্তু ডেলিভারি রয়ে যাবে অনিশ্চয়তার কুয়াশায় ঢাকা।
সিআইডির নজরে অতীতের ছায়ারা-
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, অতীতের ই-কমার্স প্রতারণার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে কয়েকজনকে ঘিরে তদন্ত এখনো থেমে নেই। অর্থ পাচার, প্রতারণা—এমন নানা অভিযোগের ফাইল এখন সিআইডির ফিনান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের টেবিলে খোলা রয়েছে।
তদন্তে উঠে আসছে সম্ভাব্য যোগসাজশের গল্প—একটি অদৃশ্য জালের মতো, যেখানে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও আদালতে এখনো কিছু প্রমাণিত হয়নি, তবুও সংশ্লিষ্ট মহলে বিষয়টি নিয়ে বাড়ছে কৌতূহল ও শঙ্কা।
‘চেক ডেলিভারি’: প্রতিশ্রুতির আড়ালে প্রতারণার ছোঁয়া?
এদিকে ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে এক রহস্যময় কৌশল—‘চেক ডেলিভারি’। নামটি যতটা নিরীহ শোনায়, বাস্তবে ততটাই জটিল ও বিভ্রান্তিকর। বাইকের আশ্বাস দিয়ে অর্থ নেওয়া, তারপর সময়ক্ষেপণ—একটি দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প, যার শেষ অনেক সময় শূন্যতায় মিশে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের স্কিমে স্বপ্ন দেখানো হয় দ্রুত লাভের, সহজ কিস্তির, কিংবা অবিশ্বাস্য কম দামের। কিন্তু সেই স্বপ্নের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে ক্ষতির বীজ।
অর্থের রহস্যময় যাত্রা- তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, অতীতের এসব কার্যক্রমে বিপুল অর্থের লেনদেন হয়েছে, যার একটি অংশ বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে। সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, অজানা উৎস—সবকিছুই এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে সূক্ষ্মভাবে। যদিও এসব তথ্য এখনো বিচারাধীন, তবুও অর্থের এই অদ্ভুত পথচলা নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে স্বপ্নবাজ তরুণেরা-এই গল্পের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়টি তরুণদের নিয়ে। কম দামে বাইক, সহজ কিস্তি—এই লোভনীয় প্রলোভনে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন তারাই। কেউ চাকরি খুঁজছেন, কেউ উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন—আর সেই স্বপ্নের ফাঁকেই ঢুকে পড়ছে প্রতারণার ছায়া।
সতর্কতার শেষ আলো-অর্থনীতি বিশ্লেষকদের পরামর্শ—
অবাস্তব অফার দেখলেই থমকে দাঁড়ান। অপরিচিত ওয়েবসাইটে বড় অঙ্কের অগ্রিম পরিশোধ এড়িয়ে চলুন।
কোম্পানির লাইসেন্স, পূর্ব ইতিহাস, ডেলিভারি রেকর্ড—সবকিছু যাচাই করুন।
কারণ ই-কমার্সের এই রঙিন জগতে, প্রতিটি ক্লিকের আড়ালেই লুকিয়ে থাকতে পারে অজানা গল্প—কখনো স্বপ্নের, আবার কখনো প্রতারণার।
(চলবে—৩য় পর্বে: ই-কমার্স প্রতারণার নেপথ্যের অর্থের গোপন স্রোত ও কারা সেই অদৃশ্য খেলোয়াড়?)
