বৃহস্পতিবার, ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ছাত্রলীগ নেতা থেকে ‘রেলের বাদশা’ রাজনীতির রং বদলে ফের গুরুত্বপূর্ণ পদে সফিকুর

স্টাফ রিপোর্টার
সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬ ৮:২৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

আওয়ামীলীগ সাবেক নেতা সফিকুর। ফাইল ছবি

একটি ডিও লেটার যেন ‘আলাদিনের চেরাগ’ হয়ে এসেছিল নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মো. সফিকুর রহমানের জীবনে। আওয়ামী লীগের সবশেষ শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুনের সুপারিশপত্রের পরই খুলে যায় তাঁর পদোন্নতির পথ। এক মাসের ব্যবধানে তিনি বাগিয়ে নেন ঢাকা রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) পদ।

গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে কর্মচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, ফাইল আটকে রাখা এবং স্বেচ্ছাচারিতার নানা অভিযোগ ওঠে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অবশ্য বদলে যায় তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের খোলস। অভিযোগ রয়েছে, রাতারাতি তিনি বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করেন। সেই পরিচয়েই ডিআরএম পদে মেয়াদ পূর্ণ করার পর পান আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবিধা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসা একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি না হয়ে কীভাবে জুলাই আন্দোলনের পরও তাঁর পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে প্রত্যাবর্তন হলো। এ নিয়ে রেলের জুলাই আন্দোলনের পক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে চাপা ক্ষোভ রয়েছে বলে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগ মন্ত্রীর ডিও লেটারে পদোন্নতি

বর্তমানে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিন্টেন্ডেন্ট (সিওপিএস)-এর দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ সফিকুর রহমান। তিনি নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সদস্য এবং ছাত্রজীবনে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন বলে প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে।

২০২২ সালের ২৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকারের সবশেষ শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন সফিকুর রহমানের জন্য একটি ডিও লেটার দেন। ওই চিঠিতে সফিকুর রহমানকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ছাত্রলীগ সক্রিয় কর্মী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাঁর পিতা নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য—এ তথ্যও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে সফিকুরের পরিবারের সদস্যরা রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত—এমন দাবিও করা হয়েছিল।

ওই ডিও লেটারের প্রায় এক মাস পরই সফিকুর রহমান ঢাকা রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) পদে পদোন্নতি পান।

যেভাবে ভোল পাল্টে বিএনপি

সফিকুর রহমানের ডিআরএম পদের মেয়াদ নির্বিঘ্নে শেষ করার জন্য রেলের তৎকালীন মহাপরিচালক সরদার সাহাদাত আলীর কাছে একাধিকবার তদবির করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও নরসিংদীর খায়রুল কবির খোকন—এমন অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।

রেলের একাধিক সূত্রের দাবি, এভাবেই ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে সফিকুর রহমান বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। পরে তাঁকে অতিরিক্ত প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তার দায়িত্বও দেওয়া হয়।

তবে বারবার রাজনৈতিক পরিচয় বদলের অভিযোগে রেলের বিএনপি-জামায়াতপন্থী কর্মকর্তাদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয় বলে জানা গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল সফিকুর রহমানকে রেলভবনে জনসংযোগ পরিচালক পদে সরিয়ে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

তবে সেই অবস্থানও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি আবারও ফিরে আসেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে—রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিন্টেন্ডেন্ট (সিওপিএস) হিসেবে। বর্তমানে তাঁর দায়িত্বের আওতায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম রুটের ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো রয়েছে।

কামরা ফাঁকা রেখেই ছেড়ে দেন ট্রেন

সফিকুর রহমানের রেলওয়ে ক্যারিয়ারের শুরু ঢাকা অঞ্চলের টিকিট ব্যবসার নিয়ন্ত্রক পদ ডিসিও দিয়ে। ওই পদে থাকাকালেই তাঁর বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ ওঠে।

রেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, ২০২২ সালের আগে ঈদের ছুটির সময় একটি পুরো কামরা ফাঁকা রেখেই ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। ঈদের সময়ে ঘরমুখো মানুষের ভিড়ে যখন টিকিটের জন্য হাহাকার চলছিল, তখন এমন ঘটনায় রেলের অভ্যন্তরে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

তবে তাঁর প্রভাবের কারণে সেই সমালোচনা বেশি দূর এগোয়নি বলে দাবি করেছেন রেলের একাধিক কর্মকর্তা।

বেয়ারাকে বানিয়েছেন গৃহকর্মী—অভিযোগ

সফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। পাবনার ঈশ্বরদী স্টেশনের বেয়ারা জরিনা বেগমকে প্রায় চার বছর ধরে নিজের ঢাকার বাসার গৃহকর্মী হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, বছরের পর বছর ওই রেলকর্মীকে দিয়ে ঢাকার বাসার বিভিন্ন কাজ করানো হয়েছে। ক্ষমতার প্রভাবের কারণে ঘটনাটি দীর্ঘদিন চাপা পড়ে ছিল বলেও অভিযোগ তাঁদের।

ফাইল আটকে রাখার অভিযোগ

ট্রেন চলাচলে গতি আনতে গত ২৩ আগস্ট ৫২৫ জন গেটকিপারকে পয়েন্টসম্যান পদে পদোন্নতি দেয় রেলওয়ে। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট ফাইলটি সফিকুর রহমান অনুমোদন করেন প্রায় দেড় মাস পর। এরই মধ্যে একই আদেশ পাকশী ও লালমনিরহাটে কার্যকর হয়ে যায়।

একইভাবে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি স্টেশন মাস্টারদের গ্রেড-৪ থেকে গ্রেড-৩-এ পদোন্নতির ফাইলও তিনি অনুমোদন করেন চার মাস পর, গত ১৮ জুন—এমন অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারীর ভাষ্য, আওয়ামী লীগ ঘরানার রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—এমন একজন কর্মকর্তার ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটের ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণের প্রধান দায়িত্বে থাকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফাইল অনুমোদনে ধীরগতি এবং কর্মচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার নিয়েও তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

কর্তৃপক্ষ যা বলছে

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মামুনুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ব্যস্ততা দেখান। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও তাঁর কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক শিল্পমন্ত্রীর দেওয়া ডিও লেটার সম্পর্কে জানতে চাইলে পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিন্টেন্ডেন্ট (সিওপিএস) মোহাম্মদ সফিকুর রহমান বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক শিল্পমন্ত্রীর মাধ্যমে দেওয়া কোনো আধা-সরকারি পত্রের (ডিও লেটার) তথ্য তাঁর জানা নেই।

কর্মচারীদের দিনভর অফিসের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো কর্মচারীকে ”বুক অফ” করার অর্থ হলো নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে তাঁকে অফিসে তলব করা। ওই দিন সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর কোনো ডিউটি থাকে না। আমি সুবিধাজনক সময়ে তাঁদের কথা ও অভিযোগ শুনে থাকি।

সফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।